বিদ্যুৎ খাত লুটপাটে জড়িত ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ
সামিট ও অ্যাগ্রিকো যথাক্রমে সজীব ওয়াজেদ জয় ও রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে।
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৫, ০৯:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গত ১৫ বছরে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ খাতের। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, ক্যাপাসিটি চার্জের নামে নেওয়া এই বিপুল অঙ্কের টাকাই পাচার করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাতজন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি সরাসরি জড়িত। গতকাল সোমবার (১২ মে) সংস্থাটি বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি পাওয়া প্রায় সব কম্পানির মালিকরাই অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত। তথ্যানুসন্ধানে ‘সেভেন স্টার’ নামে একটি প্রভাবশালী চক্রের সন্ধান মিলেছে, যারা এই অর্থপাচারের মূল হোতা এবং বর্তমানে বিদেশে নিরাপদে অবস্থান করছেন। এই সেভেন স্টার গ্রুপে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সাবেক মুখ্য সচিব ও এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এবং সামিট গ্রুপের মালিক মুহাম্মদ আজিজ খান। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে অর্থপাচারকারীরা এই সেভেন স্টার গ্রুপকে কমিশন দিয়েই বিদেশে টাকা পাঠাতেন।
এছাড়াও, অর্থপাচারের সহায়তাকারী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নরের নামও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রার পরিবর্তে ডলারে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয় অর্থপাচারের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের কারণেই দেশে দীর্ঘদিনের ডলার সংকট এবং ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পথে এবং ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতিতে সংকট সৃষ্টি করেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো একাধিকবার সরকারের কাছে বিক্রি করে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি গোষ্ঠী।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ৮৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব যোগ করলে এই অঙ্ক এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা মূলত ডলারে পরিশোধিত হওয়ায় ডলার সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে সামিট গ্রুপ প্রায় ১০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা এবং অ্যাগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল সাত হাজার ৯৩২ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েছে, যাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যথাক্রমে সজীব ওয়াজেদ জয় ও রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নাম উঠে এসেছে।
২০০৮-০৯ অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এই অঙ্ক ২০১২-১৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার মধ্যে ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় পৌনে ৯ হাজার টাকা। এটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এক লাফে ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। ওই বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৭ হাজার ১৫৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অথচ এ সময় বেসরকারি তথা রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কমেছে। পরের দুই অর্থবছরে প্রায় একই পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানা গেছে। যা সবই ডলারে পরিশোধিত হয়েছে। এটিই ডলারসংকট উসকে দেয়।
চীনা কম্পানি এরদা পাওয়ার হোল্ডিংস নিয়েছে সাত হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। এর বাংলাদেশে অঘোষিত এজেন্ট ছিলেন আবুল কালাম আজাদ। দেশি কম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার হোল্ডিংস নিয়েছে ছয় হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। রুরাল পাওয়ার কম্পানি লিমিটেডকে (আরপিসিএল) নিয়েছে পাঁচ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। মে বাংলা ক্যাট গ্রুপ নিয়েছে পাঁচ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগে গড়ে ওঠা পায়রা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েছে চার হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। অপর একটি গ্রুপকে চার হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং খুলনা পাওয়ার কম্পানিকে (কেপিসিএল) চার হাজার ৫৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই কম্পানির ৩৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা সামিট গ্রুপের। আর ৩৫ শতাংশ ইউনাইটেড গ্রুপের। বাকি ৩০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। ফলে এটির ক্যাপাসিটি চার্জের বড় অংশই গেছে সামিট ও ইউনাইটেডের পকেটে।
ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে দেশীয় কম্পানি হোসাফ গ্রুপ দুই হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা, মোহাম্মদী গ্রুপ দুই হাজার ৫৪৪ কোটি, ডরিন গ্রুপ দুই হাজার ১৮৩ কোটি ও ম্যাক্স গ্রুপ দুই হাজার ১৫৪ কোটি টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এপিআর এনার্জি দুই হাজার ৮৭ কোটি এবং সিঙ্গাপুরের সেম্বকর্প দুই হাজার ৫৭ কোটি টাকা নিয়েছে।
শাহজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র এক হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা, সিকদার গ্রুপ এক হাজার ৮৪২ কোটি, কনফিডেন্স গ্রুপ এক হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ ইংল্যান্ড পাওয়ার কম্পানি এনইপিসি কনসোর্টিয়ামের হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র এক হাজার ৫২৮ কোটি টাকা পেয়েছে।
শ্রীলঙ্কান কম্পানি লক্ষধনভি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস এক হাজার ৪০১ কোটি টাকা, সিনহা গ্রুপ এক হাজার ৩৯১ কোটি, আনলিমা গ্রুপ এক হাজার ২৭৪ কোটি, বারাকা গ্রুপ এক হাজার ২৪৭ কোটি, রিজেন্ট গ্রুপ এক হাজার ৩৭ কোটি এবং এনার্জিপ্যাক এক হাজার ২৭ কোটি টাকা নিয়েছে। এই তালিকায় আরো কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে গিয়ে গত ৯ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ১৫ কোটি টাকা। দেশটি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছর। সে বছর ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল প্রায় ৫০১ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছর আমদানি বাড়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়ে দাঁড়ায় ৯২২ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছর কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৮৪০ কোটি টাকা। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৬৮ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছর বিদ্যুৎ আমদানি কিছুটা বাড়ে, সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জও। ওই অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় এক হাজার ৭৮ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি আরো বৃদ্ধিতে চুক্তি হয়। এতে ক্যাপাসিটি চার্জ এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছর ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছর এক হাজার ৮০৫ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছর এক হাজার ৭২৪ কোটি টাকা। আর ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর মিলে আমদানির বিপরীতে চার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে।
শুরুতে তিন বছর মেয়াদে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে মেয়াদ। আবার একই কেন্দ্র সরকারের কাছে একাধিকবার বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় শোধ করে দিলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটা ওই কম্পানিরই রয়ে যায়। পরে মেয়াদ বাড়ানো হলেও একই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে ফের নির্মাণ ব্যয় পরিশোধ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে। কুইক রেন্টালের লাইন্সেস পেয়ে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়েছে, তারা প্রায় সবাই ঋণ খেলাপি। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির চক্রে পড়ে এভাবেই দেশের অর্থনীতির ভিত দুর্বল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।