’৭৫ এর বিপ্লব থেকে ’২৪ এর গণ অভ্যুত্থান: জিয়া পরিবারের বহমান ঐতিহ্য
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
আজ ঐতিহাসিক সাতই নভেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরানো দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক এক দিন। এই দিনটি মাইলফলক হয়ে জাতিকে আলো দেখিয়েছে কীভাবে গভীর সংকটের মধ্যেও জাতির হাল ধরে বিধ্বস্ত একটি দেশকে উন্নয়নের গতিতে ফেরানো যায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ যখন চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, ঠিক সেই মুহূর্তে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হলেও এই ঘটনা দেশকে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত করে এবং ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সচল সরকার ছিল না। এমন এক অভিভাবকহীন ও শংকাজনক পরিস্থিতিতে জাতির ত্রাতা হিসেবে অবির্ভূত হন তৎকালীন গৃহবন্দি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।
ছয় নভেম্বর মধ্যরাতের পর ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিরা এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান ঘটান। তাঁদের প্রথম লক্ষ্যই ছিল খালেদ মোশাররফ কর্তৃক বন্দি করা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা। সিপাহিরা ট্যাংকের কনভয় নিয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে এলে তাঁদের আকাশছোঁয়া স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ এবং ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে প্রকম্পিত ঢাকার রাজপথে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে আসেন। জনতা ও সিপাহিদের এই অভূতপূর্ব মিলনে ট্যাংকের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয় এবং পুরো জাতি এক মহাবিপদ থেকে মুক্তির আনন্দে মেতে ওঠে।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের এই সিপাহি-জনতার সফল বিপ্লবের মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পদে পুনর্বহাল হন এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকলেও দেশের মূল দেশপ্রেমিক শক্তির ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান।
এই বিপ্লব বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করেছিল যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা গেলেও চিরকালের জন্য স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। এটি ছিল একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য জনগণের আকুতির এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। ৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পট পরিবর্তন তৎকালীন রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে দেশে মুক্ত রাজনীতির নবযাত্রা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠিত হয় এবং দেশ বহুদলীয় গণতন্ত্রের আলোয় নতুন পথচলা শুরু করে।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সমাসীন হন বহুমাত্রিক রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তৎকালীন ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হাল ধরে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেন। কেবল রাজনৈতিক সংস্কারই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত্তিও তাঁর হাতেই রচিত হয়েছিল। বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি এবং পোশাক শিল্পের (আরএমজি) গোড়াপত্তন ছিল তাঁর দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার সুফল আজ বাংলাদেশ রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে ভোগ করছে। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ ও কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর দেশ যখন পুনরায় এক চরম সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন গণতন্ত্র রক্ষার তাগিদে রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের কাঠামো ধ্বংস করলে, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে আপসহীন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছরের রাজপথের লড়াই, একাধিকবার কারাবরণ এবং ৭ দলীয় জোটের সফল নেতৃত্বের মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখ দেখায় দেশ। ছাত্র সংসদের ঐতিহাসিক বিজয় এবং তাঁর দূরদর্শী নির্দেশনায় স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
২০০৭ সালের এক-এগারোর পর থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও মানবাধিকারের যে চরম বিপর্যয় ঘটেছিল, তার বিরুদ্ধে রাজপথে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনে সুদূর লন্ডন থেকে তাঁর ভিডিও বার্তা ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা তরুণ প্রজন্মকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও প্রবাসের দেশপ্রেমিক শক্তিকে একতাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে ৫০টিরও বেশি মিথ্যা মামলা দায়ের এবং তাঁর অরাজনৈতিক চিকিৎসক স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমানকেও প্রহসনের সাজার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বেই বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে এই রাজনৈতিক পরিবার অতন্দ্র প্রহরীর মতো ভূমিকা পালন করেছে । যখনই দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সিপাহি-জনতার সেই ঐতিহাসিক জাগরণকে স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও গণতন্ত্রের সুরক্ষায় এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরম্পরার অবদান অনস্বীকার্য।
