জামায়াত আমির
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথে ফয়সালা’
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথেই তার ফয়সালা হবে। সংবিধান সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে মত দিয়েছেন। সেই রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি সংবিধানের কোনো বিধানে আছে কি না, সরকারকে তা ব্যাখ্যা করতে হবে। তিনি বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের নামে কোনো ধরনের ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।
তিনি আরও বলেন, ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনের জন্য জাতি গর্বিত হলেও জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্য বারবার ছিনতাই হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহকে আর হারিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই চব্বিশ না হলে আমি এখানে বক্তব্য দিতে পারতাম না, সংসদ সদস্য হতে পারতাম না, বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারতাম না। একইভাবে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারত না।’
তবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি আশাহত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা ব্যক্তিদের ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল এবং এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল যাতে ভবিষ্যতে আর ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে। সেই লক্ষ্য অর্জনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় শহীদদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না এবং রাষ্ট্র অকৃতজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সরকারের সমালোচনা
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই আন্দোলন ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এবং এর কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।
হাসিনুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, সরকার ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে যাকাতের অর্থ অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে। তিনি এসব উদ্যোগ বাদ দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
‘জুলাই আন্দোলন ছিল সবার’
পল্টন থানা জামায়াতের সেক্রেটারি মঞ্জরুল ইসলাম বলেন, রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলন নতুন গতি পায়। আন্দোলনটি কোনো একক ব্যক্তি, সংগঠন বা দলের ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে তা সফল হয়।
ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া পুরোনো ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা করা যাবে না।
তিনি সরকারের প্রতি গণভোটের রায় মেনে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
শহীদ পরিবারের বিচার ও সংস্কারের দাবি
সভায় শহীদ মোবারক হোসেনের বাবা রমজান আলী বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন না করেই অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। নতুন সরকারের কাছে তিনি বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, সরকারের বক্তব্যে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে শহীদ পরিবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
শহীদ মেহেদী হাসানের বাবা শেখ জামাল হাসান বলেন, জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গণহত্যার কোনো বিচার হয়নি। বিচার ও সংস্কার প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা তাদের হতাশ করছে।
তিনি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
আহত জুলাই যোদ্ধার বক্তব্য
জুলাই আন্দোলনে আহত সালমান হোসেন বলেন, আন্দোলনটি কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হলেও আবু সাঈদের মৃত্যুর পর তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র দমনে যত বেশি শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, আন্দোলন ততই বিস্তৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন পেশার নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।
তিনি আরও বলেন, গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বাইরে অন্য কোনো পথে গেলে ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে নামবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকির, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, আবদুর রহমান, কামরুল আহসান হাসান, সৈয়দ সিরাজুল হক, শাহীন আহমেদ খান, মাওলানা শরিফুল ইসলাম, মহানগরীর সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনসহ মহানগরীর বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।