নিউজ কমেন্ট্রি
জামায়াত কি দ্রুত ক্ষমতায় যেতে চায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের একটি অংশের মতে, দলটির সাম্প্রতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ নয়, বরং দ্রুত ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধেও আন্দোলনের ইঙ্গিত দেন।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য গঠনমূলক রাজনৈতিক চাপের চেয়ে বরং একটি সম্ভাব্য সরকারকে শুরুতেই চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তাদের যুক্তি, একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলা, অন্যদিকে সরকারকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া পরস্পরবিরোধী অবস্থান। এতে জাতীয় ঐক্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি প্রশ্ন হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জামায়াতের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নীরব কেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্ক ও সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে দলটির প্রকাশ্য বক্তব্য খুব বেশি দেখা যায়নি।
সমালোচকদের মতে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দাবির সঙ্গে এই নীরবতার একটি অসামঞ্জস্য রয়েছে।
এ ছাড়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
বিরোধীরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা সংস্কারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা জনপরিসরে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করছে। ফলে সমালোচনামূলক আলোচনা ও বিতর্কের জায়গা কমে যাচ্ছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দলটির সমর্থক বা ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
তাদের দাবি, এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়া ও জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলনমুখী রাজনীতি এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে জামায়াত নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও দলটির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে সরব থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি বা ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিয়ে জামায়াতের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে কম বলে তারা মনে করেন।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর পড়লেও এ বিষয়ে দলটির অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারত।
জামায়াতকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলটির ঐতিহাসিক ও আদর্শিক অবস্থান। সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক নিয়ে এখনো জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, দলটি সংস্কার ও নৈতিকতার কথা বললেও এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।
তবে এসব সমালোচনা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব রাজনৈতিক দলেরই ক্ষমতায় যাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া কতটা গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে কোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার প্রমাণ করা। আর সেই কারণেই জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল ও অবস্থান নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।