বিতর্কিত মামলায় কারাগারে স্কুল শিক্ষার্থীরা, ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মানবাধিকার আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, শিশুদের ক্ষেত্রেও বিতর্কিত আইনের ঢালাও ব্যবহার হচ্ছে..
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
‘সবাই থানায় গিয়ে বললো যে, ও তো ছোট মানুষ। ওকে ছেড়ে দিন। পরেরদিন টেস্ট পরীক্ষা, সেটাও বলা হলো। কিন্তু থানার ওসি বললো যে, না ছাড়া যাবে না।’
গত বছর অক্টোবরে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর থানার অভিজ্ঞতা বলছিলেন ষোলো বছরের কিশোর কাওসার হোসেন (ছদ্মনাম)।
কাওসার হোসেনের বাবা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা। বাবা-ছেলে দুজনেই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার আসামি হওয়ায় পলাতক ছিলেন।
‘আমি গ্রামে ফিরে আসি নানুর বাড়িতে। কারণ টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে। টেস্ট পরীক্ষা না দিলে তো এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারবো না। ভেবেছিলাম হয়ত পালিয়ে পালিয়ে পরীক্ষাটা দিতে পারবো। কিন্তু প্রথম পরীক্ষার রাতেই পুলিশ নানুবাড়ি থেকে আমাকে ধরে নিয়ে যায়’, বলেন কাওসার হোসেন।
কাওসার পরে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। তবে সেটা চার মাসেরও বেশি সময় পর এসএসসি পরীক্ষার মাত্র একদিন আগে। তার সহপাঠীরা এখন পরীক্ষার মধ্যে থাকলেও কাওসার পরীক্ষায় বসতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি জেলখানায় বসে জানুয়ারি মাসে কোর্টে আবেদন করি। কিন্তু কোর্ট বলেছে যে, টেস্ট পরীক্ষা না দিলে এসএসসির ফরম ফিলআপ করা যাবে না। আমার স্কুলেও যোগাযোগ করা হয়। তারাও বলে টেস্ট পরীক্ষা ছাড়া এসএসসি দেওয়া যায় না। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষা আমি কীভাবে দেবো? আমি তো জেল হাজতে ছিলাম!’
সম্প্রতি, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে কাওসারের মতো স্কুল শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার এবং মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে না পারার কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।
বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো বিতর্কিত আইনের বিভিন্ন ধারায় আটক এসব কিশোরদের অনেকে জামিনও পাচ্ছে না।
আঠারও বছরের নিচে যাদের বয়স, এমন কিশোরদের গ্রেপ্তার কিংবা জামিন পেতে বিলম্ব হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানাচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীদের অনেকেই।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, আইন অনুযায়ী মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু কিংবা অসুস্থ থাকলে তাদের জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলেও জামিন দিতে পারবে। কিন্তু এর ব্যত্যয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ধরেন আমার ছেলে যদি হয় ষোলো বছর বয়স। তার তো বিবেক-বুদ্ধি এখনও ডেভেলপ করে নাই। সে একটা মিছিলে যদি সত্যিই গিয়ে থাকে, তাকে কি আপনি আট মাস কারাগারে রেখে দেবেন?’
‘রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে’ রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ পরিবারের
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ছিলো নাইম হাসানের (ছদ্মনাম)। তবে ক্লাস টেনে থাকাকালীন সময়ে তিনি গতবছর ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিলে অংশ নেন।
সেই ছবি দেখে পরে তাকে শনাক্ত করে পুলিশ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তার নাম ওঠে।
তারপর একদিন বাসা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
‘আমি তখন টেস্ট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমি যে মামলার আসামি সেটা আবার পরিবার জানে না। এরমধ্যেই পুলিশ ধরে নিলো।’, বলেন নাইম হাসান।
গ্রেপ্তারের পর স্কুলশিক্ষার্থী হওয়ায় নাইমকে রাখা হয় গাজীপুরের টঙ্গিতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে। এর কিছুদিন পরই শুরু হয় টেস্ট পরীক্ষা। নাইম হাসান যেখানে অংশ নিতে পারেননি।
‘আমি কারাগারে ছিলাম চব্বিশ দিন। কয়েকবার শুনানি হয়েছে, কিন্তু জামিন হয় নাই। শেষপর্যন্ত স্কুল থেকে প্রত্যয়নপত্র, প্রমাণপত্র ইত্যাদি জোগাড় করে যখন দেওয়া হইছে ততদিন আমার টেস্ট পরীক্ষা প্রায় শেষ। ফলে জামিন পেলেও আর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
নাইম হাসানের দাবি, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা না হলে হয়ত আগেই জামিন পেতেন তিনি।
‘যেহেতু সন্ত্রাসবিরোধী মামলা, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মামলা, সে কারণে উপর থেকেই একটু চাপ দেওয়া হয় যে জামিন দ্রুত না নিতে পারি।’
নাইম হাসান এখন নতুন করে ক্লাস টেনে ভর্তি হয়েছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার।
তবে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন কিশোরদেরও কেউ কেউ রাজনৈতিক মামলায় আটক হয়ে দিনের পর দিন কারাগারে আছেন, এরকম অভিযোগও আছে।
এরকমই একটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয় গত বুধবার।
‘আমার ছেলেকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি পুলিশ। রাস্তায় নাকি মিছিল হয়েছিল। কিন্তু আমার ছেলে তো সেটা জানে না। মিছিলের পর এসে তাকে পেয়ে ধরে নিয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় ঢুকায় দিয়েছে। আমার ছেলে যদি রাজনীতি করতো তাহলে তো জানতাম। তার মোবাইলে সার্চ করেও সন্দেহজনক কিছু পায় নাই। পরে মোবাইলও ফেরত দিয়েছে থানা থেকে।’
বলেন রাজিয়া বেগম (ছদ্মনাম)। যার ছেলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার হন ৮ মাস আগে। কিন্তু দফায় দফায় চেষ্টা করেও জামিন হয়নি।
পরিবারটির আতঙ্ক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে নিজেদের পরিচয়ও প্রকাশ করতে চায় না।
‘আমার ছেলে আমাকে ছাড়া কোথাও এক রাত থাকেনি। ও এমনিতেই একটু বোকা ধরনের। যখনই দেখা করতে গেছি, শুধু কান্নাকাটি করে। বলে কখন জামিন হবে। আট মাস তো হয়েই গেলো! আমারতো আর সেই সামর্থ্য নাই যে আজকে (কারাগারে) ঢুকেছে আর কালকে বের করে নিয়ে আসবো।’
হতাশ কণ্ঠে বলেন রাজিয়া বেগম।
শিশু কারাগারে ‘বিতর্কিত আইনে’ ৫৭ শিশু-কিশোর
কাওসার এবং নাইম হাসান এসএসসি পরীক্ষা দিতে না পারলেও জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তারা দুজনেই আটক ছিলেন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে, যেখানে আঠারও বছরের কমবয়সি আসামিদের রাখা হয়। গাজীপুরের টঙ্গিতে এই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র স্থানীয়ভাবে শিশু কারাগার হিসেবেও পরিচিত।
কাওসার এবং নাইম হাসানের সূত্র ধরে এই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে তাদের মতোই এরকম বহু শিক্ষার্থী কিংবা কিশোরের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন মামলায় আটক হয়ে আছেন।
এদের কেউ জামিন পেয়েছেন। আবার অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না।
মূলত, আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগের মিছিলে যাওয়া, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো নানা অভিযোগে তারা আটক হয়েছে।
মামলার ক্ষেত্রে আবার কয়েকটি আইনের ব্যবহার দেখা যায়। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইন।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে এই ৪টি আইনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৫৭ জন।
বিভিন্ন সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যাদের একটা বড় অংশই ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থাৎ রাজনীতি সংশ্লিষ্ট।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া যায়। এসব মিছিল থেকে কিংবা মিছিলে সন্দেহভাজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেই অনেকেই আটক হয়েছেন। আটকদের মধ্যে যাদের বয়স আঠারো বছরের নিচে তাদেরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ মে পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সন্ত্রাসবিরোধীসহ ৪টি আইনের অধীনে গ্রেপ্তারের পর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আনা হয়েছে ১২৮ জনকে। এসব কিশোরদের মধ্যে কেউ কেউ জামিন পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ জামিন না পেয়ে আটক আছেন।
রাজিয়া বেগম জানিয়েছেন, তার ছেলে আট মাস ধরে কারাগারে। নিম্ন আদালতে জামিন না হওয়ায় এখন তিনি উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করছেন।
সমালোচনা কেন হচ্ছে?
সাম্প্রতিককালে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নানারকম ঝটিকা মিছিলের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব মিছিলকে ঘিরে আটকের ঘটনাও আছে।
দেখা যাচ্ছে, এসব আটকের সময় বিশেষ ক্ষমতা আইন, দ্রুত বিচার কিংবা সন্ত্রাস দমন আইনের এমন সব ধারায় মামলা দেওয়া হচ্ছে, যেগুলো জামিন অযোগ্য।
তবে শিশু-কিশোরদের জামিনের সুযোগ থাকলেও অনেক সময়ই সেটা হচ্ছে না। মানবাধিকার আইনজীবীদের অনেকেই যার সমালোচনা করছেন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ওমর ফারুক বলেন, আইন অনুযায়ী মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু কিংবা অসুস্থ থাকলে তাদের জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলেও জামিন দিতে পারবে। কিন্তু এর ব্যত্যয় করা হচ্ছে।
‘ধরেন আমার ছেলে যদি হয় ষোলো বছর বয়স। তার তো বিবেক-বুদ্ধি এখনও ডেভেলপ করে নাই। সে একটা মিছিলে যদি সত্যিই গিয়ে থাকে, তাকে কি আপনি আট মাস কারাগারে রেখে দেবেন?’
ওমর ফারুক বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে পুলিশ হোক, আইনজীবী হোক, আদালত হোক -সবখানেই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। বিশেষকরে মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয় সেটা দেখতে হবে।
অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কোষাধ্যক্ষ ব্যারিস্টার নাজিয়া কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঢালাওভাবে, বিশেষত যে-সব আইন বিতর্কিত, সেগুলোতে গ্রেফতার করা ঠিক হচ্ছে না। গ্রেপ্তার হলেও জামিন যেন বিলম্ব না হয় সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
এরকমভাবে যদি মামলা হয়, গ্রেপ্তার হয়, তদন্ত চলতে থাকে একটা বাচ্চার ব্যাপারে যে এক/দেড় বছর ধরে জেলে। এখন সে যদি জামিনের আবেদন করে, সেটা আবার নাকচ করা হয়, তাহলে ঐ বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী?’
তার মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে শুরুতেই কঠোরতা না দেখিয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া দরকার।
‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন বা এ ধরনের আইনগুলো যদি প্রয়োগ করতে চায়, তাহলে শুরুতেই সেটা করা উচিত নয়। বরং প্রথমে তার পরিবারকে ডেকে সতর্ক করা উচিত, বোঝানো উচিত। তারপরও যদি একই অপরাধ হয়, তাহলে তো আইনে কঠোর হওয়ার সুযোগ আছেই’, বলেন নাজিয়া কবির।
মানবাধিকার আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, শিশুদের ক্ষেত্রেও বিতর্কিত আইনের ঢালাও ব্যবহার হচ্ছে।