EN ☀️
×

Follow Us

রাজনীতি

নির্বাচনপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

নির্বাচনপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য

ছবি: কামরুল ইসলাম রতন

অ অ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এই বিজয় কেবল বিএনপির নয়, বরং এটি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের বিজয়।

শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত নির্বাচনপরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান মূলত নির্বাচনী ফলাফল, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য, ৩১ দফা ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোকপাত করেন।

ডেইলি সানের পাঠকদের জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো— 

প্রিয় দেশবাসী

আসসালামু আলাইকুম

দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারো বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। আলহামদুলিল্লাহ।

এ বিজয় বাংলাদেশের। এ বিজয় গণতন্ত্রের। এই বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের।  আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন।

আমি দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানাই। সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে আপনারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছেন।

ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি... এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।    

আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে

দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে...

এ জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। 

জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত: গণতন্ত্রের বাতিঘর। 

সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানাই, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্ত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।  

প্রিয় দেশবাসী

জনমনে সৃষ্ট সকল সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই।

জনগণের প্রত্যাশিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গণতন্ত্রের ইতিহাসে আপনাদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্মকর্তা, জনপ্রশাসন, সশস্ত্রবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্য এবং রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ...

আপনাদের আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হতোনা। আপনাদের  অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

এই নির্বাচনে দেশি বিদেশি গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্ত্বপূর্ণ। আপনাদের প্রতিও রইলো অকৃত্রিম শুভেচ্ছা।

৭১ এর স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ...  এই দীর্ঘ সময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, হতাহত হয়েছেন, যাদের রক্ত মাড়িয়ে, কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে আজকের এই গণতান্ত্ৰিক বাংলাদেশ, সেই সকল বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। মহান আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফিরাত কামনা করছি।

যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন, হতাহত হয়েছেন, দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আপনাদের ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ রাখবে।

প্রিয় দেশবাসী

জনগণের রায় পেলে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারাদেশে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছিল দলীয় ইশতেহার।

একইসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে 'নোট অফ ডিসেন্ট' দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছিল। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ। 

সারাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামি জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের।

এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি  আমাদেরকে ভারাক্রান্ত করে।

রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল অবিচল।

আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুম খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করছি।

প্রিয় দেশবাসী

স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারো রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে... এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে। 

এবার আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই, শত নির্যাতন নিপীড়ণের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারত সংগ্রামে অটুট অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি আমি আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করেছি।

নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এ জন্য শত উস্কানির মুখেও আমি  সারাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহবান জানাচ্ছি। 

কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে...

এ জন্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম।

আমরা আল্লাহর দরবারের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে আমরা বিজয় উৎসব পালন করেছি।

আমার বক্তব্য স্পষ্ট, যে কোনো মূল্যে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকান্ড বরদাস্ত করা হবেনা। 

দলমত ধর্ম বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যাই হোক, কোনো অজুহাতেই দুর্বলের উপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না। ন্যায়পরায়ণতাই' হবে আদর্শ।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত ...প্রতিটি বাংলাদেশী নাগরিকের জন্যই আইন সমান।

আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।

নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই।

দেশে গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রতি আহ্বান, আসুন যেভাবে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ভূমিকা রেখেছিলাম একইভাবে এবার দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে আমরা  বাংলাদশকে একটি নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি।

একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে আমি ভিন্ন দল কিংবা ভিন্নমতের সকলের সহযোগিতা আশা করছি।

বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক শক্তি, সকল প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের প্রতি আবারো বিজয়ের অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি।

আল্লাহ হাফেজ। 

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ।

আরও পড়ুন