জামায়াতের হিন্দু প্রার্থী কি ভোটারদের টানতে পারবেন?
ধর্ম নয়, সুপেয় পানির সমাধানই যেখানে ভোটের মূল মানদণ্ড
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
খুলনা - ১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আলোচনা তৈরি করলেও, ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ইসলামপন্থি দল হলেও খুলনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে ‘উদারনীতির’ প্রমাণ রাখতে চেয়েছিল জামায়াত।
তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। ভোটাররা বলছেন, ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং এলাকায় পানির সমস্যাসহ নানা সংকট যারা সমাধান করবেন বলে মনে হবে, মূলত তাকেই ভোট দেবেন তারা।
খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে দাকোপ ও বটিয়াঘাটা নিয়ে গঠিত খুলনা- ১ আসনে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বিগত সময়ে। এমনকি স্বাধীনতার পর বেশিরভাগ সময়ই এই আসনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামী কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দেয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে এবার আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ভোটারদের হিসাব কী হয় তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরছে খুলনাসহ দেশের রাজনীতিতে।
যদিও জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী ভোটের মাঠে নিজের অবস্থান জোরালো বলে দাবি করে বলছেন, ‘নির্বাচনে বিজয়ী হলে সংসদে গিয়ে আড়াই কোটি হিন্দুর হয়ে কথা বলবো আমি।’
অন্যদিকে, বিএনপি নেতারা বলছেন, খুলনার ছয় আসনেই বিজয় হবে তাদের। দুইটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও জয় তাদেরই হবে বলে দাবি করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা।
এলাকার সংকট কী কী?
দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-১ আসনটির বেশিরভাগ এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত। স্থানীয় অনেকেই বলছেন, এই এলাকায় সুপেয় পানির অভাব। গ্রীষ্মকালে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় পানি লবণাক্ত হয়ে যায়, ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে।
রান্না ও খাবার পানির তীব্র সংকটের কথা উল্লেখ করে একজন হিন্দু ভোটার বলেন, ‘বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখি, সেটাই খাই। কেনা পানি খাই। গরমকাল আসলে নদীর জল লবণ হয়ে যায়, তখন তো কিনেই খাই।’
এর আগে বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, এবার যেহেতু ওই দলটি নির্বাচনের মাঠে নেই, তাই যে তাদের পানির সমস্যার সমাধান করতে পারবেন বলে মনে হবে, তাকেই ভোট দেবেন।
কয়েকজন নিজেদের নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্বাচন বা ভোটের বিষয়ে কথাই বলতে চাননি। তবে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান।
খুলনার দাকোপ উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়নের কাঁকড়া বুনিয়া গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতেই খাবার ও রান্নার পানি নিয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছেন গৃহিণীরা। প্রতিটি বাড়িতেই প্লাস্টিকের ট্যাংক, পানি রাখার মাটির বড়ো ঘড়া দেখা গেছে।
এই চিত্র এই উপজেলার প্রায় সব স্থানেই। সুপেয় পানির অভাব এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। তাই নির্বাচন মানেই তাদের কাছে এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় খোঁজার প্রয়াস।
জলি বেগম নামে একজন গৃহিণী বলেন, ‘ভোট আসে আর যায়। পানির সমস্যার তো সমাধান করে না কেউ। সারা বছরই পানি কিনে খেতে হয়।’
এই কথার প্রমাণ মেলে এই উপজেলার চালনা পৌরসভায় বিশুদ্ধ খাবার পানি বিক্রি হয় এমন অন্তত সাতটি দোকান ঘুরে। একটি বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মী মোহাম্মদ জালাল মোড়ল জানান, সারাবছরই পানি বিক্রি করেন। ৩০ লিটারের এক গ্যালন পানি ১৫ টাকা করে বিক্রি করেন তিনি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের মোট ৩৫ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন।
এদিকে, এক সময়কার মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বিএনপি নেতাদের দাবি, খুলনা সদর আসনসহ চারটি আসনেই নিশ্চিত জয় পাবে তারা।
এক্ষেত্রে আওয়ামী ভোট ব্যাংক বিএনপি পাবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাব ১২ ফেব্রুয়ারি মিলবে বলেই জানান তারা।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘ছয় আসনেই জয় হবে আমাদের। খুলনা-১ আসনে কৃষ্ণ নন্দীতো ওই এলাকার ভোটারই না। বহিরাগত ব্যক্তিকে মানুষ ভোটই দেবে না।’
খুলনার ছয়টি আসনের মানুষই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সমস্যায় ভুগছে। বেকারত্ব, জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির অভাব নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ এখন চান এমন জনপ্রতিনিধি, যারা তাদের এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নেবেন। শুধু কথায় নয়, কাজেও করে দেখাবেন।
এদিকে, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একসময় বেশ শান্ত থাকলেও গত কয়েকমাসে বেশ অশান্ত হয়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক নয় বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সাধারণ সম্পাদক কুদরত ই খুদা।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি প্রশাসন ও পুলিশে যেভাবে আন্তরিকভাবে কাজ করা দরকার, সেটার ঘাটতি আছে।’
একইসাথে রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি জুটমিলসহ অন্তত ২৬ টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে খুলনার বিএনপি নেতাদের কোনো অভিযোগ নেই।
তবে, খুলনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচনি প্রচারণার সময় বিএনপির কর্মীরা তার কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন।
খুলনা জেলার আসনভিত্তিক ভোটারের হিসাবেও এবারে এসেছে বড়ো পরিবর্তন। বিভাগজুড়ে নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় আট লাখ।
ফলে আওয়ামী ভোট ব্যাংক ভাগের হিসাব, ভোটারদের চাহিদা সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল সমীকরণ।
আরও পড়ুন