ছবি সংগৃহীত
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাকে দেখতে ছুটে আসছেন বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা। তার অসুস্থতায় দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিভেদ ছাপিয়ে এক মানবিক আবেদনের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু বিএনপি নয়, বরং সব দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তার আশু রোগমুক্তির জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করছেন।
এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর আরোগ্য কামনা করে উদ্বেগ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরাও।
বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কারা কী লিখলেন
সোহেল তাজ
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সন্তান ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করেন। তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সারা বাংলাদেশের মানুষের সাথে আমিও মহান আল্লাহ তা ‘আলার কাছে দোয়া করি বেগম খালেদা জিয়া যেন অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন- আমিন।’

ড. মিজানুর রহমান আজহারী
দেশের জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী লেখেন, ‘নানা বিভক্তি ও বিভাজনের এ দেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এ ক্ষেত্রে অনন্য। দেশপ্রেম ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি প্রায় সবার কাছে বিশেষ সম্মানের ও শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করেছেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থ হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই মুহূর্তে গোটা জাতি তাঁকে আন্তরিক দুআয় স্মরণ করছে। দলমত নির্বিশেষে অগণন মানুষের এমন দুআ ও ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই পরম সৌভাগ্যের। আমি দেশের তরে সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করা ধর্মীয় মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল এ মহিয়সী নারীর রোগমুক্তি ও সম্পূর্ণ সুস্থতা কামনা করছি। আল্লাহ তাআলা তাঁকে দ্রুত আরোগ্য দান করুন।’

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ফেসবুকে লেখেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। রাজনীতি, দল–মত, মতাদর্শ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর জন্য সবার দোয়া কামনা করি। এক সপ্তাহ আগে এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে খুব অল্প সময়ের দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “দেশে থাকো, দেশের জন্য কাজ করো।”
অসংখ্য মানুষ একই উপদেশ দেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া যখন এই কথা বলেন তার গভীরতা, ইতিহাস, আর সত্যতা অন্যরকম। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও তিনি দেশ ও দেশের মানুষের পাশ থেকে সরে দাঁড়াননি। বেদনা, অপমান ও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান এবং বিশ্বাসের সাথে আপস করেননি। বছরের পর বছর ধরে তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়।

মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে রহমত, আরোগ্য ও শান্তি দান করেন।’
হাসিনার ফাঁসি দেখা পর্যন্ত আল্লাহ যেন খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে চিকিৎসাগত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ যেন হাসিনার ফাঁসি দেখা পর্যন্ত ওনাকে বাঁচিয়ে রাখেন।’
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাসনাত এ কথা বলেন।
মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী
বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী। সেখানে তিনি লেখেন, ‘কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা হয় নাই। ছোটবেলা থেকে একটাই ইচ্ছা ছিলো—বেগম জিয়া পরম মমতায় আমার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করে দিবেন কোনোদিন। ওনাকে রহম করো খোদা।’
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় জামায়াত আমিরের দোয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতিতে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির সংবাদ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার সার্বিক শারীরিক অবস্থা জানতে জামায়াত নিয়মিত খোঁজ-খবর নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে আমরা আন্তরিকভাবে দোয়া করছি, তিনি যেন খালেদা জিয়াকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন, তার সব কষ্ট লাঘব করেন এবং তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দেন।
খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান মাহমুদুর রহমান মান্না
বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। পরে তার ভেরিফায়েড এক ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। তিনি দেশবাসীর কাছে বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ‘আন্দালিব রহমান পার্থ ফ্যানস’ নামে একটি গ্রুপ থেকেও বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির দোয়া করা হয়েছে।
গ্রুপের একটি পোস্টে লেখা হয়, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, ফি আমানিল্লাহ, মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ আপনি আপসহীন মা দেশমাতা, তারেক রহমান সাহেবের একমাত্র ছায়া যার আদর মমতা স্নেহ ভালোবাসা থেকে ১৮টা বৎসর বঞ্চিত, সেই প্রবাসী মাজলুম তারেক রহমান সাহেবের আবেগ বটবৃক্ষ মমতাময়ী মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সুস্থ করে দিন। রহমত করুণ হে আমার রব আমার আল্লাহ।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন মালিক
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন মালিক বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা করে বলেন, ‘হে আল্লাহ! মানুষের প্রভু! রোগ দূর করো, সুস্থতা দাও! তুমিই সুস্থতা দানকারী। তোমার সুস্থতা ছাড়া কোনো সুস্থতা নেই।’
খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন রাষ্ট্রপতি-প্রধান উপদেষ্টাও
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবরে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার রোগমুক্তি কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তারা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘গণতন্ত্র উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। মহান আল্লাহর নিকট তাঁর সুস্থতা এবং একইসাথে দেশবাসীর কাছে তাঁর জন্য দোয়া প্রার্থনা করি।’ অন্যদিকে প্রেস উইংয়ের বার্তায় বলা হয়, ‘প্রধান উপদেষ্টা তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে, প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত।’
-692b08a066316.jpg)
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার ফেসবুকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখেন, ‘গণতন্ত্রের প্রশ্নে সর্বদা আপোষহীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
উল্লেখ্য, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন সরকার নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এরপর ছয় মাস পরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার সাজা স্থগিত করে মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিল সরকার। যদিও চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি।
গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। গত ৮ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান। চার মাস পর ৬ মে তিনি দেশে ফেরেন।
প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। ২৩ নভেম্বর রাতে তাকে জরুরি ভিত্তিতে এভার কেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফুসফুসে ‘সংক্রমণ’ ধরা পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরদিন চিকিৎসক জানান, কয়েক মাস ধরেই তিনি (খালেদা জিয়া) খুব ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছিলেন। কতগুলো সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সিসিইউতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ধারাবাহিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে চলছে তার।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ খ্যাত আপসহীন এই নেত্রী বিগত আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের রোষানলে পড়েন। দীর্ঘ কয়েক বছর তাকে কারাবন্দি রেখে তার ওপর চালানো হয় নির্মম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলে থাকাকালে খালেদা জিয়া স্লো-পয়জনিংয়ের শিকার হয়েছেন। তার বর্তমান অসুস্থতা স্বাভাবিক নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার আজকের অসুস্থতা স্বাভাবিক অসুস্থতা নয়। একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি আজকের এই অবস্থায় অসুস্থ হয়েছেন। তিনি বলেন, কারাগারে স্লো পয়জনিং করা হয়। ভারতীয় এক সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘খালেদা জিয়া তো বাঁচবে না দুই বছর।’ আমি বললাম কেন? তিনি জানান, ‘এমন করে ডিজাইন করা হয়েছে উনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন।’