মৃত্যুপথযাত্রী সুকুমারের যে ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মৃত্যুশয্যায় থাকা সুকুমার রায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে ছুটে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রায় সমবয়সী। তাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। উপেন্দ্রকিশোরের ছেলে সুকুমার রায়ের সঙ্গেও ঠাকুরবাড়ির ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। নিয়মিত যাতায়াতের পাশাপাশি সুকুমারের লেখা শিশুতোষ সাহিত্যও খুব পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ। তাকে কতটা স্নেহ করতেন, তা পরবর্তী নানা ঘটনায়ও স্পষ্ট হয়।
ঠাকুরবাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও নিয়মিত আমন্ত্রণ পেতেন সুকুমার। তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় ১৯১২ সালে। সে বছর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে গেলে সেখানে রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সক্রিয় সদস্য সুকুমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন।
দেশে ফিরে নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিছুদিন শিলাইদহে কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। কারণ, ১৯১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সুকুমারের বিয়ে ঠিক হয় সুপ্রভাদেবীর সঙ্গে। সুকুমার ও তার পরিবারের সদস্যরা বারবার রবীন্দ্রনাথকে বিয়েতে উপস্থিত থেকে আশীর্বাদ করার অনুরোধ করেন।
১০ ডিসেম্বর শিলাইদহে গেলেও সেখানে বেশিদিন থাকা হলো না তার। ১৩ ডিসেম্বর সোজা কলকাতায় ফিরে সন্ধ্যায় উপস্থিত হন সুকুমারের বিয়ের অনুষ্ঠানে। তাকে দেখে বিয়ের আসরে আনন্দের ঢেউ ওঠে। সুকুমারও ভীষণ খুশি হন।
পরবর্তী সময়ে সীতাদেবীর লেখা একটি প্রবন্ধে এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি বিয়েতে আসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সুকুমারের মনেও সংশয় ছিল। বিয়ে শুরুর মুহূর্তে হঠাৎ গেটের কাছে করতালির শব্দ শুনে সবাই অবাক হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়, কবি এসে বিয়ের আসরে প্রবেশ করেছেন। পরে জানা যায়, সুকুমারের বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্যই তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন। কারণ, সুকুমারকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
এর কয়েক বছর পর, ১৯২১ সালের ২ মে জন্ম নেন সত্যজিৎ রায়। তার জন্মের খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ আনন্দ প্রকাশ করে ঘনিষ্ঠজনদের বলেছিলেন, সুকুমারের সন্তান তার বাবার চেয়েও মেধাবী হবে এবং একদিন বিশ্ব জয় করবে। শোনা যায়, আশীর্বাদ হিসেবে নিজের পছন্দের একটি বিশেষ মুদ্রাও নবজাতক সত্যজিৎকে পাঠিয়েছিলেন তিনি।
তবে এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিন পরই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সুকুমার। তিনি দুরারোগ্য কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। সে সময় এই রোগের কার্যকর চিকিৎসা ছিল না। ফলে তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল খুবই কম।
সুকুমারের অসুস্থতার খবর পেয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমে যেন কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। এমনকি সারারাত পায়চারি করে কাটিয়েছেন।
এরপর কলকাতার ‘অ্যালফ্রেড ও মডার্ন’ থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ নাটকের আয়োজন করা হয়। নাটকে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। অভিনয় চলার সময় তিনি জানতে পারেন, গড়পারের বাড়িতে সুকুমারের অবস্থা সংকটজনক। এতটাই অসুস্থ যে তার কথা বলার শক্তিও নেই।
খবরটি পেয়ে আর দেরি করেননি রবীন্দ্রনাথ। পুত্রসম সুকুমারকে দেখতে সঙ্গে সঙ্গে গড়পারের বাড়িতে চলে যান। হঠাৎ গুরুদেবকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সুকুমার। তার চোখ বেয়ে পানি ঝরতে থাকে। কথা বলার ক্ষমতা না থাকলেও ইশারায় রবীন্দ্রনাথকে দুটি গান শোনাতে অনুরোধ করেন তিনি।
বাড়িতে ঢুকেই রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, সুকুমারের অবস্থা খুবই সংকটজনক। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করেন। একটি নয়, দুটি গান শোনান তিনি—‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’ এবং ‘দুঃখ এ নয়, সুখ নহে গো।’
১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৩০-এর কোঠায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম প্রতিভাবান লেখক সুকুমার রায়।
সুকুমারের মৃত্যু গভীরভাবে আঘাত করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। মৃত্যুর দুদিন পর শান্তিনিকেতনের এক উপাসনায় সুকুমারকে স্মরণ করে তিনি বলেন, আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি। কিন্তু এত কম বয়সের যুবকটির মতো অল্পকালের আয়ুটিকে নিয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্য দান করতে প্রায় আর কাউকে দেখিনি। ...তার রোগ শয্যার পাশে সেই গানের সুরটিতে আমার চিত্ত পূর্ণ হয়েছে।
সুকুমারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেদিন রবীন্দ্রনাথের দু’চোখ বেয়েও নেমে এসেছিল অশ্রুধারা।