EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

পিতৃত্ব কীভাবে পুরুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে?

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

পিতৃত্ব কীভাবে পুরুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

সন্তানের জন্ম একজন নারীর জীবনেই শুধু বড় পরিবর্তন আনে না, একজন পুরুষের শরীর ও মস্তিষ্কেও তৈরি করে গভীর পরিবর্তন। নতুন গবেষণাগুলো বলছে, বাবা হওয়ার আগেই একজন পুরুষের শরীর ভবিষ্যৎ সন্তানের যত্ন নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পিতৃত্ব একজন পুরুষকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে মাতৃত্বের পরিবর্তনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। হরমোনের ওঠানামা, মস্তিষ্কের পরিবর্তন এবং আচরণগত রূপান্তর—সবকিছু মিলিয়ে একজন পুরুষ নতুন এক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন বাবা সন্তানের যত্নে যত বেশি যুক্ত হন, তার শরীর ও মস্তিষ্কে এই পরিবর্তন তত বেশি স্পষ্ট হয়।

টেস্টোস্টেরনের মাত্রা হ্রাস

পিতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানহীন পুরুষদের তুলনায় বাবাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাধারণত কম থাকে। আর যারা সন্তানের যত্নে বেশি সময় দেন, তাদের মধ্যে এই পরিবর্তন আরও বেশি দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লি গেটলার ফিলিপাইনের সেবু শহরে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখেছেন, বাবা হওয়ার পর পুরুষদের হরমোনে স্পষ্ট পরিবর্তন আসে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২৪ জন তরুণ পুরুষের মধ্যে যারা চার বছরের ব্যবধানে বাবা হয়েছিলেন, তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সন্তানহীন পুরুষদের তুলনায় কমে যায়।

গবেষকরা মনে করেন, এই পরিবর্তন একজন পুরুষকে প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে সরিয়ে সন্তানের যত্ন, ধৈর্য ও পারিবারিক দায়িত্বের দিকে বেশি মনোযোগী করে তুলতে পারে।

শুধু সন্তান জন্মের পর নয়, অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গীর গর্ভাবস্থার সময় থেকেই এই পরিবর্তন শুরু হয়।

ভালোবাসার হরমোনের তরঙ্গ

পিতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলো অক্সিটোসিন। একে অনেক সময় ‘ভালোবাসার হরমোন’ বলা হয়।

মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অক্সিটোসিনের ভূমিকা অনেক বেশি পরিচিত। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বাবাদের শরীরেও সন্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সময় এই হরমোনের মাত্রা বাড়ে।

যে বাবারা সন্তানকে কোলে নেন, খেলেন, কথা বলেন বা বেশি সময় পাশে থাকেন, তাদের শরীরে অক্সিটোসিন বাড়তে পারে।

এই হরমোন বাবা ও সন্তানের মধ্যে আবেগপূর্ণ বন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে একজন বাবা শিশুর প্রয়োজন বুঝতে এবং দ্রুত সাড়া দিতে আরও প্রস্তুত হন।

গবেষকরা বলছেন, এটি একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি করে। বাবা যত বেশি সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান, বন্ধন তত শক্তিশালী হয় এবং যত্ন নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ে।

পুরুষের দ্বিতীয় কৈশোর

পিতৃত্ব শুধু হরমোনে পরিবর্তন আনে না, বদলে দেয় মস্তিষ্কের কার্যক্রমও।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ডার্বি স্যাক্সবে ও তার দল প্রথমবার বাবা হওয়া পুরুষদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারা দেখেছেন, সন্তান জন্মের আগে ও পরে বাবাদের মস্তিষ্কে কিছু পরিবর্তন ঘটে।

গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তন নতুন দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও সন্তানের প্রয়োজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

স্যাক্সবে পিতৃত্বের এই রূপান্তরকে কৈশোরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ কৈশোরের সময় যেমন মস্তিষ্ক নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়, পিতৃত্বেও তেমন পরিবর্তন ঘটে।

যে বাবারা অনাগত সন্তানের সঙ্গে বেশি মানসিকভাবে যুক্ত ছিলেন বা সন্তান পালনে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাদের মস্তিষ্কে পরিবর্তনও বেশি দেখা গেছে।

গবেষকরা মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্কে সন্তান লালনের একটি সুপ্ত ক্ষমতা থাকে, যা পিতৃত্বের মাধ্যমে সক্রিয় হয়।

সামাজিক পরিবর্তন

গবেষকরা বলছেন, পিতৃত্বের এই জৈবিক পরিবর্তন সমাজ ও পারিবারিক নীতিতেও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবাদের সন্তান জন্মের আগের সময় থেকেই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থার সময় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, সন্তানের প্রস্তুতিতে অংশ নেওয়া এবং পিতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ—এসব বিষয় বাবার সঙ্গে সন্তানের বন্ধন শক্তিশালী করতে পারে।

সক্রিয় বাবা শুধু পরিবারের জন্যই উপকারী নন, সন্তানের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যে বাবারা সন্তানের যত্নে বেশি যুক্ত থাকেন, তাদের সন্তানদের মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দক্ষতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সব মিলিয়ে বিজ্ঞান বলছে, বাবা হওয়া শুধু একটি সামাজিক পরিচয় নয়—এটি একজন পুরুষের শরীর, মস্তিষ্ক ও আচরণের গভীর রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া। [সূত্র: বিবিসি] 

আরও পড়ুন