ড. নাজিবুরের মৃত্যু: সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
আহসান হাবিব বরুন। ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি রাজধানীর মেট্রোরেলে ঘটে যাওয়া একটি নির্মম ঘটনা আমাদের পচাগলা সামাজিক ব্যবস্থার ভয়াবহ স্বরূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। ৬৪ বছর বয়সী প্রবীণ শিক্ষক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমান মেট্রোরেলে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি আশপাশের যাত্রীদের কাছে একটু বসার সুযোগ চেয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, অসহায় অবস্থায় তাঁর সামান্য সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু তাঁর সেই আর্তি কারও হৃদয় স্পর্শ করেনি। উদাসীনতার দেয়াল ভেদ করে কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি একটু বসার ন্যূনতম জায়গাটুকুও তাঁকে দেওয়া হয়নি। এই দৃশ্য কেবল বেদনাদায়ক নয়, আমাদের সামষ্টিক বিবেকের জন্যও এক প্রশ্নচিহ্ন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সামাজিক অবক্ষয়, নাগরিক দায়িত্বহীনতা ও মনুষ্যত্বের ক্রমাবনতির এক প্রতিচ্ছবি।
আজ থেকে দুই দশক বা আড়াই দশক আগেও আমরা জনপরিসরে ভিন্ন এক সামাজিক সংস্কৃতি দেখেছি। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হলে চারপাশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতেন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। প্রয়োজনে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়ার মতো মানবিক দায়িত্ববোধ তখন সাধারণ মানুষের আচরণের অংশ ছিল। বাসে কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রবীণ মানুষকে দেখলে নিজের আসন ছেড়ে দেওয়াও ছিল স্বাভাবিক সৌজন্য। তখন আজকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি, মেট্রোরেল কিংবা এত উন্নত নাগরিক সুবিধা ছিল না। শিক্ষার হারও বর্তমানের মতো ছিল না। কিন্তু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মায়া ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল গভীর।
আজ তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে, জীবনযাত্রার মান আধুনিক হয়েছে, মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বেড়েছে। অথচ সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের মনন, বিবেক ও আচরণের উন্নতি হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। অন্যের কষ্ট দেখার ফুরসত নেই, বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ শোনার মানসিকতা নেই। এমনকি সামান্য সহানুভূতি প্রকাশের আগ্রহটুকুও যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ক্রমে এমন এক আত্মকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে নিজের আরাম, স্বার্থ ও ভালো থাকাই মুখ্য; অন্যের দুর্দশা সেখানে প্রায় মূল্যহীন। দেখতে-শুনতে মানুষ হয়েও আমাদের চিন্তা-চেতনা ও আচরণে মনুষ্যত্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে।
তবে এই ভয়াবহ অবক্ষয়ের দায় এককভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সংকটের গভীরতা আড়াল করা হবে। এর পেছনে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার দায়ও গুরুতর। মানুষ আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে, যেখানে বিপদে পড়া কাউকে সাহায্য করতে গিয়েও আইনি জটিলতা, হয়রানি কিংবা অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই এমন প্রতারণার খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে অসুস্থতা বা বিপদের ভান করে মানুষের সহানুভূতিকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাহায্য করতে এগিয়ে আসা ব্যক্তিকেই পরে নানাভাবে নাস্তানাবুদ হতে হয়। ফলে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক তাড়নার জায়গায় সন্দেহ ও সংশয় দানা বাঁধছে।
সমাজের একশ্রেণির টাউট-বাটপার ও দুষ্কৃতকারী চক্রের প্রতারণা মানুষের নিখাদ সহানুভূতিকেও সন্দেহের চোখে দেখতে বাধ্য করছে। কেউ বিপদে পড়লে মানুষ ভাবতে শুরু করে—ঘটনাটি সত্যিই অসহায়ত্বের, নাকি এর আড়ালে কোনো প্রতারণা লুকিয়ে আছে? শহুরে জীবনে কোন ভিক্ষুক প্রকৃত অসহায় আর কে পেশাদার প্রতারক, তা যেমন বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে, তেমনই কে সত্যিকার অর্থে অসুস্থ আর কে অভিনয় করছেন, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
এই অবিশ্বাসের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্র ও সমাজের নেই। মানুষের সহানুভূতিকে যারা প্রতারণার হাতিয়ার বানায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিপদে পড়া কাউকে সদিচ্ছা থেকে সাহায্য করতে গিয়ে যেন কোনো নিরপরাধ নাগরিক অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেই সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু যখন আইন ও প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানবিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও দ্বিধা তৈরি হয়। এভাবে প্রতারণা, হয়রানি ও দায়হীনতার সম্মিলিত প্রভাবে সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়।
ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমান গণমাধ্যমে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে জানা যায়, চার-পাঁচ মিনিট ধরে তাঁর বাবা ঘামছিলেন এবং অসুস্থ অবস্থায় বসার সুযোগ চেয়েছিলেন। অথচ আশপাশের যাত্রীরা নির্বিকারভাবে নিজেদের আসনে বসে ছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। শেওড়াপাড়া থেকে উত্তরা পর্যন্ত যাত্রাপথে তাঁকে সহায়তা করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—এমন বর্ণনা আমাদের বিবেককে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। অবশ্য এই ঘটনা থেকে চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কিংবা সামান্য আগে সহায়তা পেলে তাঁর জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করা যায় না। কিন্তু অসুস্থ একজন প্রবীণ মানুষের সাহায্য চাওয়ার বর্ণনা আমাদের সামনে যে মানবিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।
একইভাবে, সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হুইলচেয়ারে থাকা এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি লিফটে উঠতে চাইলে সুস্থ ও সক্ষম যাত্রীদের ভিড় তাঁকে বাধাগ্রস্ত করে। উল্টো তাঁকে ধমকের সুরে বলা হয়, ‘এক মিনিট পরে আসেন না!’ অথচ বয়স্ক, অসুস্থ, গর্ভবতী নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া নিছক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব ও নাগরিক শিষ্টাচারের অংশ। একজন অসুস্থ প্রবীণ মানুষ কিংবা হুইলচেয়ারে থাকা একজন ব্যক্তির প্রতি এমন আচরণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সার্টিফিকেট বিতরণে সফল হলেও যদি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পরোপকারের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শিক্ষার সামাজিক মূল্য কোথায়? শিক্ষা মানুষকে শুধু কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে না; তাকে অন্য মানুষের মর্যাদা বুঝতে এবং বিপদে পাশে দাঁড়াতেও শেখাবে। সেই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শিক্ষার বাহ্যিক সাফল্যও অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই সামাজিক অবক্ষয়ের শিকড় অনুসন্ধান করলে জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতনকেও উপেক্ষা করা যায় না। দীর্ঘকাল ধরে রাজনীতির নামে ভণ্ডামি, প্রতারণা ও সুবিধাবাদিতার যে চর্চা চলছে, তার প্রভাব নাগরিকদের মনস্তত্ত্বেও পড়েছে।
ত্যাগ ও নীতির কথা মুখে উচ্চারিত হলেও বাস্তবে ভোগ-বিলাসিতা এবং ব্যক্তিস্বার্থই যখন প্রাধান্য পায়, তখন নৈতিকতার শিক্ষা মানুষের কাছে ক্রমে অর্থহীন হয়ে ওঠে। ‘ত্যাগ’ শব্দটি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, আর ‘ভোগ’ ও স্বার্থপরতা হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সেই দৃষ্টান্ত যদি সততা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার বদলে সুবিধাবাদিতা ও দ্বিচারিতাকে প্রশ্রয় দেয়, তবে নাগরিক জীবনে নৈতিক অবক্ষয় বিস্তার লাভ করবেই। মানুষ তখন নিজের আচরণের অসংগতিও উপলব্ধি করার ক্ষমতা হারাতে থাকে।
মানুষের সংখ্যা বাড়লেও মনুষ্যত্বের চর্চা সমানতালে বাড়ছে না। একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে সময়ের সঙ্গে সমাজ আরও মানবিক, জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল হওয়ার কথা; অপরাধপ্রবণতা ও নিষ্ঠুরতা কমে আসার কথা। অথচ আমাদের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফলে মানুষের ভিড় বাড়লেও হৃদয়হীনতা ও অনুভূতিহীনতার বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।
আমাদের সমাজে ধর্মের নামে বাহ্যিক লেবাস ও আনুষ্ঠানিকতার বিস্তার ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে ধর্মের মূল শিক্ষা আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে না। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি সদাচরণ, সহনশীলতা এবং বিপদে একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলামে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, অন্যের কষ্ট লাঘব করা এবং ন্যায়সংগত আচরণ করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের পাশাপাশি মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও ইনসাফপূর্ণ আচরণও ইসলামী নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আমরা সেই শাশ্বত শিক্ষার সৌন্দর্য থেকে ক্রমেই বিচ্যুত হচ্ছি।
ফেসবুক ও ইউটিউবের পর্দায় মহামানব সাজার প্রতিযোগিতা চললেও বাস্তব জীবনে একজন অসহায় বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিকতা না থাকলে সেই ধর্মীয় পরিচয় ও বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার মূল্য কী? ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা মানুষের আচরণে, দায়িত্ববোধে এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি তার সহমর্মিতায় প্রকাশ পাওয়ার কথা। অন্যের দুর্দশা দেখেও নির্বিকার থাকা, অসহায়ত্বকে উপেক্ষা করা কিংবা মানুষের কষ্টকে নিজের দায়িত্বের বাইরে ঠেলে দেওয়া ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের বাহ্যিক প্রদর্শনের চেয়ে তার মৌলিক শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করাই অধিক জরুরি।
পরিশেষে বলতে চাই, ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যু আমাদের সামনে এক মহাসতর্কবার্তা নিয়ে এসেছে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা, দায়িত্বহীনতা ও পৈশাচিক অমানবতার কবল থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে শুধু আইন বা প্রজ্ঞাপন জারি করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। পরিবার থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের চর্চায় পরিণত করতে হবে। সন্তানদের সামনে বাবা-মায়ের লাইন ভাঙা কিংবা আসন নিয়ে কাড়াকাড়ির মতো নেতিবাচক আচরণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে বিপদে পড়া মানুষ সাহায্য পাবেন, আর সদিচ্ছা থেকে এগিয়ে আসা নাগরিক অযথা হয়রানির শিকার হবেন না। প্রতারকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]