মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে অর্ধবৃত্তাকার হয়ে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন সমস্বরে নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত ট্রাফিক আইন, সাইন ও নিয়মনীতির লিফলেট পড়ছিল, তখন সেখানে এক দারুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্কুলটি জনবসতিঘেঁষা এলাকায় হওয়ায় শিশুদের সেই পড়ার আওয়াজ আশপাশের বাড়িঘরে পৌঁছে যায়। তা শুনে স্থানীয় অনেকেই ধীরপায়ে এগিয়ে এসে স্কুলের দরজা-জানালায় ভিড় করেন; কেউ কেউ উঁকিঝুঁকি দিতে থাকেন; আর তার মাঝেই কিছু শিশুর কলকণ্ঠ বাতাসে ভেসে আসছিল। অবশ্য পাঠরত শিশুদের কণ্ঠস্বর যেন সকলকে এক অজানা আকর্ষণে টানছিল!
২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)’র মাসব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে, ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার উদ্যোগে গত ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে আমরা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বিশ্বাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাই। আমাদের দলে ছিলেন নিসচা-ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহিদ ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ বেতার ঠাকুরগাঁও-এর সংবাদ পাঠক অ্যাডভোকেট ননী গোপাল বর্মন এবং সহ-সভাপতি হিসেবে আমি নিজে। কর্মসূচীটি তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আকতার হোসেন নিসচার সাথে যুক্ত থাকায়, এ উদ্যোগ আমাদের জেলা কমিটি সহজে নিতে পেরেছিল। অবশ্য শুধু নিসচা নয়, সড়কে মানুষের নিরাপদ চলাচল ও সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ ও ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশজুড়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে আমরা মোটরসাইকেলে বিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলাম। দু’পার্শ্বের সোনালী আভার আমন ধানের ফসলের ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে পিচঢালা রাস্তা। গ্রামে এমন রাস্তা এখন হামেশাই চোখে পড়ে। সড়কে দেখা গেল অনেকে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কাঁধে, বাইসাইকেলে বা মোটরসাইকেলে আলু, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি নিয়ে হাট বা বাজারে যাচ্ছেন। ছোটাছুটির দৃশ্য বলে দিচ্ছে উন্নত যোগাযোগ গ্রামীণ জনপদে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। আবার কাউকে দেখা গেল ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ভ্যানে পণ্য নিয়ে ছুটছেন গ্রামান্তরে। গ্রামের কৃষিপণ্য যেমন বাইরে যাচ্ছে, তেমনি বাইরের পণ্যও গ্রামে আসছে। ইট-পাথর-পিচের মসৃণ পথে সৃষ্ট উন্নয়নের এই অর্থনৈতিক গতিশীলতা সংশ্লিষ্টদের জীবন মান ও বিকাশ সমৃদ্ধ করবে, তা বলাই বাহুল্য।
গ্রামগুলোর সার্বিক অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি উন্নত না হলেও, কিংবা দু-একটি পাকা ঘরের পাশাপাশি নতুন এই পাকা রাস্তা যে মানুষের জীবনে এক নতুন জোয়ার এনেছে তা স্পষ্ট দৃশ্যমান। রাস্তায় যেতে যেতে ফসল উৎপাদন, বিক্রি এবং জীবন-জীবিকা নিয়ে কথা হলো অনেকের সাথে। রাস্তার উন্নতি হওয়ায় সাইকেলের পাশাপাশি এখন মোটরসাইকেল ও চার্জার ভ্যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মাইক্রোবাসও স্বচ্ছন্দে ছুটছে। গ্রামীণ সড়ক এভাবে আঞ্চলিক সড়কের সাথে মিলে মহাসড়কের সাথে যুক্ত হয়েছে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-সিলেট যাওয়ার দূরপাল্লার কোচ এখন প্রায় মানুষের ঘরের কাছে এসে পৌঁছেছে, যা মাত্র কিছুকাল আগেও ছিল অকল্পনীয়।
কথোপকথনে অনেকে সড়ক দুর্ঘটনার নিয়তিকে স্রষ্টার ওপর ছেড়ে দিয়ে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করলেন। সার ও বীজের দাম ও মানে অনেকের ক্ষোভ থাকলেও, পাকা রাস্তাকে তারা পরিবর্তনের সাহস হিসেবে দেখছেন। এতে চিকিৎসায় সিদ্ধান্ত নেওয়া, শিক্ষায় ভালো-মন্দ বুঝে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। পথের গতিকে তারা জীবনের জটিলতা নিরসনে কাজে লাগাতে চান। অনেকে উৎপাদন আর অর্থনৈতিক ভাবনার কথা জানালেন। এ সময় ২-৩টি মোটরসাইকেলে তিনজন করে তরুণের আমাদের পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে যাওয়াকে একজন গ্রামের ‘নতুন বিপদ’ হিসেবে অভিহিত করলেন। আরোহীদের তো বটেই চালকের মাথায়ও হেলমেট নেই। গ্রামের মানুষের প্রত্যাশা—যেহেতু সড়কের রূপান্তর ঘটছে, সেহেতু সড়কে চলাচলের নিরাপত্তাসহ গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক ভাবধারায় রূপান্তর দরকার।
পথের ক্লান্তি-শ্রান্তি মাড়িয়ে যখন বিদ্যালয়ে পৌঁছালাম, তখন বিকেল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। আমরা পৌঁছামাত্রই সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করতে যাব, ঠিক তখনই বাদ সাধল বিদ্যুৎ। স্কুলের পাশে গাছ ভেঙে পড়ায় লাইন মেরামতের কাজ চলছে। ফলে 'নিরাপদ সড়ক চাই' (নিসচা)-এর প্রামাণ্যচিত্র পর্দায় দেখিয়ে শিশুদের সরাসরি সচেতন করার উদ্যোগটি আর সফল হলো না। বিদ্যালয়ে প্রজেক্টরসহ সব ধরনের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমাদের প্রত্যাশা আর শিশুদের কৌতূহল শুধু 'আগ্রহ' হয়েই রয়ে গেল।
তবে আমরা দমে না গিয়ে গল্পের ছলে ও আড্ডার আমেজে নিরাপদ সড়ক নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। শিশুদের হাতে লিফলেট দেওয়া হলো এবং তা পড়ে শোনানো হলো। রাস্তায় নিরাপদে চলার জন্য ফুটপাত ব্যবহারের গুরুত্ব তাদের বোঝানো হলো। আর যেখানে ফুটপাত নেই, সেখানে কেন সামনে থেকে আসা যানবাহন দেখে সতর্কতার সাথে ডান দিক ঘেঁষে হাঁটতে হয়—তাও বুঝিয়ে দেওয়া হলো। মোটরসাইকেলের প্রসঙ্গে হেলমেটের কথা আসতেই উপস্থিত সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করল—যাদের বাড়িতে মোটরসাইকেল আছে, তারা চালকদের হেলমেট পরা নিশ্চিত করবে।
তবে শিক্ষার্থীদের অনেকের বেশভূষা আর শারীরিক গড়ন দেখে মনটা কিছুটা দমে গেল। ওদের জীবনযাত্রার মান কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। মনে প্রশ্ন জাগল—জীবন যেখানে ন্যূনতম মান পায় না, সেখানে শিক্ষা কীভাবে মানসম্মত হবে? কিংবা শিক্ষার মানকেই বা তারা কীভাবে ধারণ করবে? গ্রাম থেকে যে রত্ন উঠে আসে না, তা নয়। তবে তা হাজারে মাত্র একটি; কিন্তু বাকিদের ভবিষ্যৎ কী? আমাদের শিক্ষানীতিই বা এই চরম বৈষম্যের বিষয়ে কী বলে?
স্কুলে আসার পথের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথায় বুঝলাম—গ্রামের রাস্তাগুলো সময়ের প্রয়োজনে পাকা সড়কে রূপান্তরে গ্রামীণ মানুষের ট্রাফিক আইন-কানুন জানা অত্যন্ত জরুরি। আইন জানা মানেই নিজের সুরক্ষার শক্তি অর্জন করা। অবশ্য সড়ক আইন গ্রাম বা শহরের ভেদাভেদে সীমাবদ্ধ নয়; আমরা যেহেতু সবাই সড়ক ও যানবাহন ব্যবহার করি, সেহেতু প্রয়োজনীয় সড়ক আইন জানা থাকা দরকার। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় সরকারি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় আইনি দিকগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সামনে এসেছে। এভাবে প্রথমে না ভাবলেও, বাস্তবতা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাছাড়া শৈশবের শিক্ষা মনে গভীর দাগ কাটে, তরুণ-যুবক বয়সের শিক্ষা নানাবিধ ব্যস্ততায় অনেক সময় মন থেকে হারিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অনেকের বাইসাইকেল চালানোর অভ্যাস থাকায় রাস্তায় চলাচলে বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হলো। কেননা আমাদের লক্ষ্য—পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়।
পরিশেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে যখন ফিরতি পথ ধরলাম, তখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল অন্য একদিনের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। স্মৃতিতে ভেসে উঠল আজকের মতোই এক বিকেল। গ্রীষ্মের সূর্য উত্তাপ ছড়িয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছে। ঠিক এমন মুহূর্তেই ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন চত্বরের ফুলবাগানের দেয়াল ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে রাখা তিনটি কফিন চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। সকালে যে মানুষগুলো ছিলেন প্রাণবন্ত ও চঞ্চল, পরিবার-পরিজনের আশা-ভরসার ছায়া—তাদেরই নিস্তব্ধ-নিথর দেহ তখন জানাজার অপেক্ষায় স্তব্ধ। গতি আর নিয়তির এই প্রভেদই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি সড়কের বাঁকে লুকিয়ে থাকে সচেতনতার ডাক। এই সচেতনতা মানুষের জীবন, জীবিকা এবং পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের বন্ধনের প্রশ্নে অপরিহার্য।
দিনটি ছিল ১৯ মে ২০২৫ সাল। মাইক্রোবাসে রংপুরে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার প্রাণনগর ব্যাঙপুকুর (২৬ মাইল) নামক স্থানে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মাইক্রোবাসে থাকা ঠাকুরগাঁও জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসের অডিটর জুলফিকার আলী (৪৬), সহকারী অডিটর ইমরুল হোসেন (৪৫), দিনাজপুর হিসাবরক্ষণ অফিসের সুপার দেলোয়ার হোসেন (৫০) ও গাড়িচালক মানিক হোসেন (৩২)। এ ঘটনায় বালিয়াডাঙ্গী ও দিনাজপুর হিসাবরক্ষণ অফিসের আরও তিন কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।
সরকারি দায়িত্ব তথা ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পথে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হওয়ায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক সম্মান প্রদর্শনার্থে মরদেহগুলো ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন প্রাঙ্গণে আনা হয়েছিল। ঠাকুরগাঁওয়ের ইতিহাসে কর্তব্যরত অবস্থায় একসাথে তিন কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু এবং জেলা প্রশাসন চত্বরে তাদের যৌথ জানাজা সম্ভবত এটাই প্রথম ছিল। স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষবারের মতো প্রিয় মুখগুলো দেখার আকুল চেষ্টায় কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সকালে কর্মস্থলে বের হওয়ার মুহূর্তে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা জেলায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং জানাজা শেষে নিহত কর্মকর্তাদের মরদেহ যখন দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবার জন্য আলাদা আলাদা গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেক কষ্টে যারা এতক্ষণ নিজেদের সংযত রেখে চুপ করে ছিলেন, হঠাৎই তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়—ডুকরে কেঁদে ওঠেন অনেকে। চারদিকের ব্যাকুল কান্নায় মনে হচ্ছিল, সকলেই যেন তাদের একান্ত স্বজনকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাচ্ছেন।
এভাবে কঠিন এক পরিস্থিতির সমাপ্তি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোতে শুরু হয় এক চিরন্তন শূন্যতা। এমন শূন্যতা কেবল এই পরিবারগুলোরই নয়, যারা সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের স্বজন হারিয়েছেন, এ যেন তাদের সবারই গল্প। সামনের একেকটি দিন এই মানুষদের কাছে একেকটি পাহাড়ের মতো এসে দাঁড়ায়, যা অতিক্রম করা তাদের পক্ষে যেমন কঠিন, তেমনি সমাজ বা দেশের পক্ষেও। কারণ, প্রতিটি অকাল মৃত্যু পরিবার-সমাজ-দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। সত্যিই—'একটি সড়ক দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না!'
শিশুদের মাঝে নিরাপদ সড়কের বার্তা বিলি করে ফেরার সময় উপরোক্ত ঘটনার কথা ভেবে বারবার মনে হচ্ছিল—সড়কে মানুষের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে সড়ক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের মতো দুর্বল অবকাঠামোর দেশে সচেতনতাই শক্তি, সচেতনতাই বল, সচেতনতাই জীবন রক্ষার পদ্ধতি! কেননা সড়ক সংক্রান্ত নানা ধরণের জটিলতা অনেক সময় আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। আইন আছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও আছে; আইন প্রয়োগের বিভিন্ন ধরণের সফলতাও আছে। কিন্তু দিন যত বাড়ছে, মানুষের সংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে সকলের চোখের সামনে দুর্ঘটনাও অব্যাহত গতিতে বেড়েই চলছে। সড়ক সচেতনতা তাই আজ কোনো বিলাসিতা নয়, আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত। কেননা দুর্ঘটনা মানে সকল সম্ভাবনার পরাজয় এবং মৃত্যু। আর এমন পরাজয় ও মৃত্যুকে সঙ্গী করে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়! কিন্তু জীবন তো আমাদের তো এগিয়ে যেতেই হবে।
দিনাজপুরের বীরগঞ্জের এই সড়ক দুর্ঘটনা শেষও নয় শুরুও নয়। আবার ২০ অক্টোবর ২০২৬ ভোরে নাটোরের বনপাড়ায় আরপি স্পেশাল পরিবহনের সাথে বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যুও শেষ সংবাদ নয়। যদিও আমাদের প্রত্যাশা সেটাই। এগুলো আসলে বাংলাদেশের সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থার এক নির্মম প্রতীকী চিত্র। সড়কের এই বাস্তবতা আমাদের হেলা-অবহেলায় প্রতিদিনই রূঢ় হচ্ছে নিহতদের নির্মমতা আর আহতদের আহাজারিতে। সমাজকর্মী এস এম আজাদ হোসেন লিখেছেন, "নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য। একটি বাক্যে যেন বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাটিই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ সমৃদ্ধির অর্থ শুধু সেতু, মহাসড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা দ্রুতগতির যান চলাচল নয়; সমৃদ্ধির প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষ সেই সড়কে কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে।" (ঢাকা টাইমস, ০১লা অক্টোবর, ২০২৬)।
উক্ত প্রতিপাদ্যের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, নিরাপদ সড়কের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের সাথে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর মতো সাদামাঠা ধরনের স্লোগান না জুড়ে দিয়ে প্রতিপাদ্যে ‘সবার আগে মানুষ’ হওয়া উচিত ছিল। কেননা দেশের উপর সড়ক আর সড়কের উপর মানুষ। সুতরাং মানুষই প্রথম এবং শেষ বিবেচ্য। আর মানুষ না থাকলে সড়কই কি দেশই বা কী? অন্য কিছুরই বা আয়োজন কিসের? সুতরাং সকল কিছুতেই মানুষের নিরাপত্তা মুখ্য হওয়া উচিত। সেই সাথে নিশ্চিত চলাচলের লক্ষ্যে মানুষের যাবতীয় সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
সমাজকর্মী এস এম আজাদ হোসেন তার ওই লেখায় আরও উল্লেখ করেছেন যে ‘..বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২০২১ সালের সরকারি হিসাবে নিহত ৫ হাজার ৮৪ জনের বিপরীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। অনুমানের ভিত্তি ও সরকারি তথ্যের পদ্ধতি এক নয়-তবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ব্যবধান আমাদের দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে নতুন করে দেখার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। … বিআরটিএর আগস্ট ২০২৬-এর হিসাবে ৪১৭টি দুর্ঘটনায় ৪১৮ জন নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে আগস্ট মাসে ৫১৩ টি দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক গড় প্রাণহানি ১৫.৬৫% বেড়েছে। … পরিসংখ্যানে পার্থক্য থাকলেও উভয় তথ্যই একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে-সড়কে ঝুঁকি এখনো বড়। এখানেই একটি জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। পুলিশ, বিআরটিএ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, সড়ক ও জনপথ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তথ্য একটি অভিন্ন কাঠামোয় যুক্ত হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে। কোথায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে, কোন ধরনের যান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোন সড়ক বা মোড় বারবার দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে-এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।’
আমরা দেশের উন্নয়নকে জনগণের কল্যাণে মেলাতে চাই; উন্নয়ন যাত্রায় শামিল করতে চাই। এই চিন্তা ইতিবাচক। তবে আমাদের চাওয়া আর বিশ্বাস যদি সত্যি হয়, তাহলে সর্বাগ্রে শৃঙ্খলার সাথে মানুষের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রকে সর্বশক্তি নিয়ে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শৃঙ্খলার মান যেকোনো বিচারে বজায় রাখা সম্ভব হলে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ যাবে। নিরাপদ সড়কের সাথে জীবন-জীবিকার সার্বিক সুরক্ষার প্রশ্ন জড়িত থাকায় সংশ্লিষ্টদের শুধু দায়িত্ব নিলেই হবে না, সেই সাথে উপযুক্ত জবাবদিহির সাথে দায়ও নিতে হবে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আইনের একটি সুশৃঙ্খল চেইন তৈরি করা জরুরি। সড়কে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্পৃক্ততা থাকায় এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারের মৌলিক প্রতিষ্ঠান—যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদকে নির্দিষ্ট দায়-দায়িত্বে বাঁধতে হবে জাতীয় দুর্ঘটনা ও সহায়তা তথ্যভান্ডার’-এর আদলে। পাশাপাশি, সড়ক দুর্ঘটনায় সরকারি আর্থিক সহায়তাসহ সার্বিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা সকলেই অবগত যে, মানুষের জীবন রক্ষার কাজটি বেশ কঠিন। এখানে কঠোর শৃঙ্খলা ও সমন্বয় দরকার। দায়িত্ব আর জবাবদিহির দায়ের মাধ্যমে যথাযথ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ছাড়া নিরাপদ সড়ক গঠন অসম্ভব! সড়ককে বাদ দিয়ে আধুনিক জীবনযাপন কল্পনা করা যায় না; এটি আমাদের মৌলিক চাহিদার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং, নিরাপদ সড়কের লক্ষ্যে দোষারোপের পালা শেষ করে এবার শুরু হোক সুনির্দিষ্ট কর্মারোপের পালা…
লেখক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিজন, ঠাকুরগাঁও