EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

ফ্যামিলি কার্ডের অর্থনীতি

লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তায় নারীর সক্ষমতা, পারিবারিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

খালেদা আক্তার

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম

লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তায় নারীর সক্ষমতা, পারিবারিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
অ অ

দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আমাদের প্রচলিত আলোচনায় লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তাকে প্রায়ই শুধুমাত্র ‘ব্যয়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকার দরিদ্র পরিবারকে কিছু অর্থ দিল এবং তারা সেই অর্থ দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কিনল—অনেকেই ভেবে থাকেন, এটুকুই যেন এর অর্থনৈতিক প্রভাব। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। সঠিক পরিবারের কাছে সঠিকভাবে নগদ সহায়তা পৌঁছাতে পারলে এর প্রভাব একটি পরিবারের আয় বা ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই অর্থ স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করে অন্যের আয় তৈরি করতে পারে, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে পারে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে এবং অর্থনীতিতে একটি ছড়িয়ে পড়া বা ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে।

যেমন ধরা যাক, একজন নিম্ন আয়ের মানুষ কিছু নগদ সহায়তা পেলেন। এই টাকা দিয়ে তিনি প্রথমে কী করবেন? উন্নয়ন অধ্যয়নের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যখন নিম্ন আয়ের একজন মানুষের কাছে কোনো নগদ সহায়তা আসে, তখন প্রথমেই তিনি সেই টাকা ভোগ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় করেন। তিনি প্রথমে যান তাঁর পাশের ছোট দোকানে, যেখান থেকে তিনি নিয়মিত কিছু কেনেন। অর্থাৎ নগদ সহায়তার একটি অংশ চাল, ডাল, মাছ, ওষুধ কিংবা স্থানীয় পরিবহনে ব্যয় করেন। এটি তাঁর কাছে ভোগব্যয় হলেও দোকানদারের কাছে সেটি বিক্রয় আয়। দোকানদার সেই বিক্রয় আয় দিয়ে নতুন পণ্য কিনবেন, কর্মচারীর বেতন দেবেন অথবা পরিবহন খরচ করবেন। কর্মচারী তাঁর মজুরির একটি অংশ আবার স্থানীয় বাজারে ব্যয় করবেন।

অর্থাৎ, একজনের ব্যয় → অন্যজনের আয় → সেই আয়ের নতুন ব্যয় → আবার অন্য কারও আয়।

এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’-এর সহজতম অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে কেবল একটি সামাজিক সুরক্ষা ভাতা কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু এই অর্থ সরাসরি নারীদের কাছে দেওয়া হচ্ছে, এটি একই সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রগতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক প্রণোদনা কর্মসূচির অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ সহায়তা পাওয়ার পর প্রথম তিন মাসেই পরিবারগুলো প্রাপ্ত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দৈনন্দিন ভোগে ব্যয় করেছিল। দীর্ঘস্থায়ী পণ্য কেনার খরচও ধরলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বিশেষভাবে দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ তুলনামূলক দ্রুত বাজারে খরচ করেছে।¹

এখানেই লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব। সীমিত সরকারি অর্থ যদি এমন পরিবারের হাতে পৌঁছায়, যাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন বেশি এবং সঞ্চয়ের সুযোগ কম, তাহলে সেই অর্থ দ্রুত বাজারে ফিরে আসে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারের ভোগক্ষমতাই বাড়ে না; স্থানীয় দোকান, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য সেবা খাতেও চাহিদা তৈরি হয়। অর্থাৎ দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করা শুধু সামাজিক সুরক্ষার বিষয় নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি সামগ্রিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক গতি আনতে পারে।

নগদ সহায়তার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু সুবিধাভোগী পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি বোঝাতে কেনিয়ার একটি বড় গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণাটি ২০২২ সালে Econometrica জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা গ্রামীণ কেনিয়ার ৬৫৩টি গ্রামের ১০ হাজারের বেশি দরিদ্র পরিবারকে প্রায় ১,০০০ ডলার করে এককালীন নগদ সহায়তা দেওয়ার পর স্থানীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ করেন।

গবেষণায় দেখা যায়, নগদ সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর ভোগ ও সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি আশপাশের এমন পরিবারও উপকৃত হয়েছে, যারা সরাসরি কোনো অর্থ পায়নি। স্থানীয় দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি এবং আয়ও বেড়েছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের হাতে দেওয়া অর্থ বাজারে ঘুরে অন্য পরিবার ও ব্যবসার কাছেও পৌঁছেছে।

গবেষকেরা এই প্রভাবকে প্রায় ২.৫-এর স্থানীয় গুণক প্রভাব হিসেবে হিসাব করেছেন। সহজভাবে বলতে গেলে, স্থানীয় অর্থনীতির নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এক একক নগদ সহায়তা প্রায় আড়াই একক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করেছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এত বড় অঙ্কের অর্থ স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করলেও গড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল খুবই সীমিত।

এই গবেষণাটিও দেখায়, সঠিক পরিস্থিতিতে নগদ সহায়তা কেবল দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের ভোগক্ষমতা বাড়ায় না; বরং স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আশপাশের পরিবারগুলোর আয়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।²

মেক্সিকোর ‘প্রোগ্রেসা’ (Progresa) কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও দেখায় যে নগদ সহায়তার সুফল শুধু সরাসরি সুবিধাভোগী পরিবারেই আটকে থাকে না। American Economic Review-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, একই গ্রামের যেসব পরিবার কর্মসূচির আওতায় ছিল না, তারাও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে।

সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলো অনানুষ্ঠানিক ঋণ, পারিবারিক সহায়তা কিংবা অর্থ ভাগাভাগির মাধ্যমে অন্য পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে পেরেছে।³ গবেষকদের হিসাবে, নির্দিষ্ট পরিবারকে প্রতি ১০ পেসো নগদ সহায়তা দেওয়ার বিপরীতে একই গ্রামের অন্য পরিবারগুলোর ভোগ প্রায় ১ পেসো পর্যন্ত বেড়েছিল।

অর্থাৎ নগদ সহায়তার একটি অংশ সামাজিক ও আর্থিক যোগাযোগের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ফলাফল দেখায়, লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের কল্যাণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভেতরেও একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক ছড়িয়ে পড়া প্রভাব তৈরি করতে পারে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন