EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

বাকস্বাধীনতা: অধিকার, নাকি অন্যের ক্ষতি করার লাইসেন্স?

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

বাকস্বাধীনতা: অধিকার, নাকি অন্যের ক্ষতি করার লাইসেন্স?

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

স্বাধীনতার পক্ষে যে কণ্ঠ রাজপথে উচ্চারিত হয়েছে, সেই কণ্ঠের মর্যাদা রক্ষা করাও আমাদের দায়িত্ব। আমরা এমন একটি সমাজ চেয়েছি, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে পারবে এবং ক্ষমতার ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারবে। রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে কাউকে ভয় কিংবা নিপীড়নের মুখে পড়তে হবে না। কিন্তু যে স্বাধীনতার জন্য এত আকাঙ্ক্ষা, তার ব্যবহার নিয়ে আজ আমাদের নিজেদের কাছেই একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন। আমরা কি বাকস্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দায়িত্বটুকুও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?

বাকস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক জীবনের অপরিহার্য অধিকার। এই অধিকার মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং ক্ষমতার জবাবদিহি দাবি করার সুযোগ দেয়। তবে নিজের বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা অন্যের নিরাপত্তা ও অধিকারকে অগ্রাহ্য করার অবাধ ছাড়পত্র নয়। একই সঙ্গে কারও বক্তব্য অপ্রিয়, কঠোর বা অস্বস্তিকর হলেই সেটি বন্ধ করার যুক্তি তৈরি হয় না। স্বাধীনতার অর্থ বুঝতে হলে এই দুই সত্যকে পাশাপাশি রাখতে হবে।

সমালোচনা ও অপপ্রচারের পার্থক্য

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিমত থাকবে, প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এসবকে বিরোধিতা হিসেবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে করা সমালোচনা ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানই যুক্তিসংগত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।

সমস্যা দেখা দেয়, যখন আলোচনার কেন্দ্রে থাকা সিদ্ধান্ত বা কাজকে সরিয়ে ব্যক্তিকে হেয় করার চেষ্টা শুরু হয়। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ ছড়ানো, বক্তব্যের অংশবিশেষ বিকৃত করে প্রচার করা কিংবা কাউকে ভয় দেখানো কোনো বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে না। আবার ব্যক্তিগত সমালোচনা মাত্রই অপপ্রচার নয়। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার সুযোগ থাকতে হবে। পার্থক্যটি নির্ধারণ করতে হবে বক্তব্যের বিষয়বস্তু, তথ্যের ভিত্তি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে; শুধু কে বক্তব্যটি দিয়েছেন, তা দেখে নয়।

তথ্য প্রকাশের আগে যাচাইয়ের দায়িত্ব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষকে কথা বলার নতুন পরিসর দিয়েছে। একটি মতামত বা সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এই সুবিধার সঙ্গে ভুল তথ্যের ঝুঁকিও বেড়েছে। কোনো অভিযোগ যাচাই না করেই শেয়ার করা হলে একজন মানুষের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পরিবার বিপদে পড়তে পারে এবং জনমনে অকারণ উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তাই কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের আগে উৎস দেখা, সম্ভব হলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া এবং প্রমাণের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করা জরুরি। ভুল তথ্য দেওয়া আর জেনেশুনে মিথ্যা ছড়ানো এক বিষয় নয়। একজন মানুষ ভুল করতে পারেন; গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভুলটি জানার পর সংশোধন করা। একইভাবে, প্রমাণের অভাব থাকলে অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। সত্যনিষ্ঠা ও সতর্কতা মতপ্রকাশকে দুর্বল করে না, বরং বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

ভিন্নমত সহ্য করার সাহস

আমরা প্রায়ই নিজের মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হই, অথচ বিরুদ্ধমত শুনতে অস্বস্তি বোধ করি। নিজের পক্ষে উচ্চারিত বক্তব্যকে স্বাধীনতা আর বিপক্ষের বক্তব্যকে অপরাধ মনে করার এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সংকুচিত করে। বাকস্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই, যেখানে অন্যের বক্তব্য আমাদের বিশ্বাস বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।

ভিন্নমতকে সম্মান করার অর্থ তার সঙ্গে একমত হওয়া নয়। যুক্তি দিয়ে বিরোধিতা করা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থানও পুনর্বিবেচনা করা একটি পরিণত সমাজের পরিচয়। অবশ্য হুমকি, হয়রানি কিংবা সহিংসতায় উসকানির মতো আচরণের প্রশ্ন আলাদা। সে ক্ষেত্রেও আবেগ বা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রতিকার নির্ধারণ করতে হবে।

অধিকার রক্ষায় আইন ও ন্যায্যতার ভারসাম্য

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার নিশ্চিত করা একে অন্যের বিপরীত লক্ষ্য নয়। কারও বিরুদ্ধে ভুল অভিযোগ ছড়ানো হলে তিনি জবাব দিতে, সংশোধন চাইতে এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রতিকার নিতে পারবেন। তেমনি ক্ষমতাবান কারও সমালোচনা করা হয়েছে বলেই যেন সমালোচককে ভয় দেখানো বা নীরব করে দেওয়ার সুযোগ না থাকে।

এ কারণে মতপ্রকাশ নিয়ে যেকোনো আইনি ব্যবস্থায় স্পষ্টতা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচনা ও অপরাধকে এক করে দেখলে স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার প্রকৃত ক্ষতির অভিযোগকে একেবারে উপেক্ষা করলেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। দায়িত্বশীল রাষ্ট্রকে উভয় দিক বিবেচনায় রাখতে হয়।

রাজনীতিতে ভাষা ও আচরণের দায়

রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। নীতি, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়া কিংবা চরিত্রহননকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা শেষ পর্যন্ত জনপরিসরের আলোচনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাতে সাধারণ মানুষ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার বদলে বিভ্রান্তির মুখে পড়ে।

রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সাংবাদিক, পেশাজীবী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী—সবারই এখানে ভূমিকা আছে। যাঁরা বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তাঁদের বক্তব্যের প্রভাবও বেশি হতে পারে। তাই মতপ্রকাশের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, ভাষার সংযম এবং ভুল সংশোধনের মানসিকতা জরুরি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে দৈনন্দিন এই আচরণগুলোর মধ্য দিয়েই।

সবার জন্য সমান স্বাধীনতা

বাকস্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট দল, মত বা পরিচয়ের জন্য সংরক্ষিত অধিকার নয়। আজ যে ব্যক্তি ক্ষমতায় আছেন, কাল তিনি বিরোধী অবস্থানে থাকতে পারেন। আজ যে বক্তব্য আমাদের পছন্দ, আগামীকাল তার বিপরীত বক্তব্য শুনতে হতে পারে। তাই কোনো কণ্ঠের নিরাপত্তা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

আমরা এমন পরিবেশ চাই, যেখানে নাগরিক সরকারি সেবার দুর্বলতা নিয়ে কথা বলতে পারবেন, সাংবাদিক অনিয়ম তুলে ধরতে পারবেন, চিকিৎসক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারবেন। স্বাধীন গণমাধ্যম, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই এবং নাগরিক সচেতনতা এই পরিবেশকে শক্তিশালী করতে পারে।

শেষ কথা

আমরা বাকস্বাধীনতা চেয়েছি ভয় ছাড়াই সত্য বলার জন্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সমান মর্যাদায় বসবাস করার জন্য। সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে হলে নিজের বক্তব্যের প্রভাবও ভাবতে হবে। কথা বলার সাহস যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শোনার ধৈর্য, ভুল স্বীকারের সততা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান।

স্বাধীনতা মানে নীরবতা নয়, আবার দায়িত্বহীন উচ্চারণও নয়। আমরা সমালোচনার সুযোগ চাই, কিন্তু প্রমাণহীন অভিযোগকে উৎসাহ দিতে চাই না। আমরা নিজের মত প্রকাশ করতে চাই, পাশাপাশি অন্যের মত প্রকাশের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে চাই। অধিকার ও দায়িত্বের এই ভারসাম্যই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি।

বাকস্বাধীনতার মর্যাদা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে আমরা সেটিকে কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপর। যে কণ্ঠ অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠেছিল, সেই কণ্ঠ যেন সত্য, যুক্তি ও মানবিকতার পক্ষেই দৃঢ় থাকে।


ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী

স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল

[email protected]

আরও পড়ুন