কথার ঊর্ধ্বে কাজ: গণআস্থা ও জাতীয় পুনর্গঠনের নতুন দিগন্ত
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি কেবল কে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তা নয়; বরং কীভাবে রাষ্ট্র মানুষের আস্থা অর্জন করবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে সাধারণ মানুষের চাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাঁরা নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং একটি দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা চান। এই প্রত্যাশার জবাব শুধু বক্তব্যে দেওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন দৃশ্যমান কাজ এবং সেই কাজের ধারাবাহিকতা।
“এই দেশটা আমার, এই দেশের মানুষের স্বপ্নও আমার।” এই অনুভূতি শুধু আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক আচরণে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। জনগণই রাষ্ট্রের মূল শক্তি; তাঁদের কল্যাণই হওয়া উচিত সব রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রধান বিবেচনা।
গণআস্থা অর্জনের প্রথম শর্ত জবাবদিহি
গণআস্থা দাবি করে পাওয়া যায় না, কাজের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান, সরকারি সেবায় হয়রানি কমানো, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট অগ্রগতি আস্থা গড়ে তোলে। একইভাবে ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মতভিন্নতা থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করাই রাজনীতির উদ্দেশ্য হতে পারে না। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং সহনশীল আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মানুষ যেন ভয় ছাড়া মত প্রকাশ করতে পারে এবং ন্যায্য অধিকার চাইতে পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক স্বস্তি ও তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ
একটি পরিবারের কাছে অর্থনীতির প্রথম হিসাব শুরু হয় বাজারের খরচ থেকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, চিকিৎসা ব্যয়, বাসাভাড়া এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ সামলাতে না পারলে বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সুরক্ষা বাস্তব অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।
পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, দক্ষ পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা এবং শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে রূপ দিতে পারে। রাজধানীর বাইরেও এসব সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সমান জরুরি।

দুর্নীতি প্রতিরোধ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান
সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, ন্যায্য ক্রয়প্রক্রিয়া, সরকারি অর্থ ব্যয়ের নজরদারি, নাগরিকের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগের নিশ্চয়তা। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকারকে নিয়মের ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে ব্যক্তি পরিবর্তনের সুফলও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
রাষ্ট্রীয় সেবাকে সহজ ও নাগরিকবান্ধব করাও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি সনদ, একটি চিকিৎসাসেবা কিংবা একটি ন্যায্য অভিযোগের নিষ্পত্তির জন্য মানুষকে যেন অযথা ঘুরতে না হয়। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন এবং সেবার মান নিয়মিত মূল্যায়ন এই পরিবর্তনকে বাস্তবসম্মত করতে পারে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নারীর নিরাপত্তা
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কোনো সমাজের জন্য গৌণ বিষয় নয়; এগুলো মানবিক উন্নয়নের ভিত্তি। যুগোপযোগী পাঠক্রম, দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা এবং শিক্ষার সমান সুযোগ ছাড়া ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণ কঠিন। একইভাবে সাশ্রয়ী চিকিৎসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি মনে করি, অসুস্থতার সময় মানুষের আর্থিক সামর্থ্য যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার প্রধান বাধা না হয়।
নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং জনপরিসরে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সমান সুযোগ, হয়রানির প্রতিকার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন পূর্ণতা পায় না। একটি সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারী ও পুরুষ উভয়েই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ
বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে পারস্পরিক সম্মান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ মানবসম্পদ ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক বিনিয়োগের আস্থা বাড়াতে সহায়ক। একই সঙ্গে রপ্তানির নতুন বাজার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা সম্ভব। বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
শেষ কথা
আমাদের সামনে পথ সহজ নয়। কিন্তু পরিবর্তনের শুরু হতে পারে খুব সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত থেকে: কথার মূল্যায়ন হবে কাজ দিয়ে, আর কাজের মূল্যায়ন হবে মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে। পদ, পরিচয় কিংবা দলীয় অবস্থানের চেয়ে বড় হয়ে উঠুক সততা, দায়িত্ববোধ এবং জনসেবার মানসিকতা।
দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশকে এবং ক্ষমতার ঊর্ধ্বে জনগণকে স্থান দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্বশীল রাজনীতির শক্তি নিহিত। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষ কেবল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শুনবে না, নিজের জীবনেই তার সুফল অনুভব করবে। কথার ঊর্ধ্বে কাজের এই অঙ্গীকারই গণআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার পথ দেখাতে পারে।
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল