রাজনৈতিকভাবে চাঁদাবাজ এবং অপরাধীদের বর্জন করুন
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
প্রতীকী ছবি
সংবাদপত্রে চোখ রাখলেই এখন চাঁদাবাজির খবর দেখা যায়। এসব খবরে চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক খবরের শিরোনাম এরকম-চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীতে বিএনপি নেতা আটক। শিরোনাম দেখেই আঁতকে উঠতে হয়। চাঁদাবাজির অভিযোগ গ্রেপ্তার, তাও আবার বিএনপি নেতা? শিরোনাম পড়ে ভেতরে খবরে লেখা হয়েছে- রাজধানীর শেরেবাংলা নগর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে এক বিএনপি নেতাকে আটক করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২।
আটক মিজানুর রহমান স্বপন শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি। এখানে দুটি প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কাকে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা বলব? বিএনপির মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক দলে একজন ওয়ার্ড সভাপতিকে কি আদৌ বিএনপি নেতা হিসেবে সম্বোধন করা যায়? সংবাদটির শিরোনাম যদি হতো, বিএনপির ওয়াড নেতা চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার- তাহলেও সংবাদটির প্রতি কিছুটা সুবিচার করা হতো। কিন্তু তা না করে অধিকাংশ গণমাধ্যম চটকদার শিরোনাম করতে গিয়ে একজন বিএনপি কর্মীকে জাতীয় নেতা বানিয়ে দিল। এর ফলে ক্ষতি হলো বিএনপির এবং রাজনীতির। যে সংগঠনটি গত ১৭ বছর জুলুম নির্যাতন সহ্য করেও শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় দল হিসেবে টিকে আছে। এ ধরনের সংবাদের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। শুধু এই একটি সংবাদ নয়, গত এক মাসে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির যত সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তার সবই একই ধরনের।
এর আগের দিন এক সংবাদের শিরোনাম ছিল, চাঁদাবাজির অভিযোগে খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহিনুর আলমকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-১)। রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যিনি সাবেক, তিনি বিএনপির নেতা হন কীভাবে? এভাবে চাঁদাবাজির সব সংবাদে বিএনপির নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কি কেবলই সংবাদের প্রতি পাঠকদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য নাকি বিএনপির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত মিথ্যা অপপ্রচারের অংশ? এই প্রশ্নের উত্তর জানাটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখনও বিএনপির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে দেশে একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। এবারও কি সেই একই ষড়যন্ত্র চলছে?
এবার একটু খতিয়ে দেখা যাক, যাদের চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের আসল পরিচয় কি? মিজানুর রহমান স্বপন বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন ২০২৪ এর ডিসেম্বরে। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। ২৪ এর পাঁচ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে স্বপন চাঁদাবাজি করতো। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের একাধিক মামলা ছিল। পাঁচ আগস্টের পর স্বপন প্রথমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছায়ায় আশ্রয় নেয়, পরে সুযোগ বুঝে বিএনপিতে ঢুকে পড়ে।
অন্যদিকে শাহিনুর আলমকে বিএনপি গত বছরের জানুয়ারিতে দল থেকে বহিষ্কার করে। তখনও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। শাহীনুল সম্প্রতি এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
এভাবে প্রতিটি চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় হয় তারা ২০২৪ এর আগস্টের পরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছে অথবা পাঁচ আগস্টের পর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তাহলে এদের দায় বিএনপির ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে কেন?
২০২৪ এর পাঁচ আগস্টের পর দলের হাইকমান্ডের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বহু লোক বিএনপিতে ঢুকেছে। এদের অধিকাংশই সুবিধাবাদী, মতলববাজ। এদের কেউ স্থানীয় পর্যায়ের চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসী। বিএনপির অনেক নেতাই এলাকায় নিজেদের প্রভাব বাড়াতে এইসব চিহ্নিত অপরাধীদের দলে আশ্রয় দেয়। এইসব চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আসলে কোন দলের আদর্শের অনুসারী নয়। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তারা তখনই নিজেদের অপরাধ কর্ম নির্বিঘ্নে করার জন্য সেই দলে আশ্রয় নেয়। ক্ষমতাসীন দলে ঢুকে এরা চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অপরাধ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পায় কারণ তারা ক্ষমতার লোক। এভাবেই চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। তবে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবার পর চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করেছেন। চাঁদাবাজ কিংবা সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
একদিকে যেমন প্রধানমন্ত্রী দলের ভেতরে আবর্জনা পরিষ্কার করছেন অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারা এখন চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুরু করেছেন। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছেন তাতে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ চাঁদাবাজ মুক্ত হবে। তবে এখানে কিন্তু আছে। আমরা লক্ষ্য করছি, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত চাঁদাবাজরা অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছে। সেই দলে গিয়ে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজি করছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। এই মানসিকতা নিয়ে আর যাই হোক চাঁদাবাজি বন্ধ করা যাবে না। চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাস বন্ধে প্রধানমন্ত্রী নিজ ঘর পরিষ্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে সকল রাজনৈতিক দলকে একযোগে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। তাদের উচিত বিএনপি থেকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি কিংবা চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত কাউকে নিজেদের দলে স্হান না দেওয়া। পাশাপাশি গনমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের দলীয় পরিচয় নয় তাদের অপকর্ম তুলে ধরতে হবে। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেই কেবল এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারি আমরা।