EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

ইউনুস গংদের দুর্নীতির তদন্তে ধীরগতি কেন?

অদিতি করিম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

ইউনুস গংদের দুর্নীতির তদন্তে ধীরগতি কেন?
অ অ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন। সন্ত্রাসের অভিযোগে অভিযুক্ত দলের নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন। শতাধিক বিএনপির নেতা ও কর্মীকে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুর্নীতি বন্ধে প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাই স্বাভাবিক কারণেই এটা প্রত্যাশিত যে, অপরাধী যেই হোক তার বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। প্রধানমন্ত্রীর এই অভিপ্রায় সর্বত্র বাস্তবায়ন হওয়া উচিত। এ কারণেই সাধারণ মানুষ আশা করে যে ইউনুস এবং তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হবে। 

ইতিমধ্যেই ইউনুসের প্রিয় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে দুদক। অভিযোগে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং বিভিন্ন নিয়োগ, পদায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের কথা বলা হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগসহ ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে কমিশন এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে সম্পদ গড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে তদন্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় দুদক। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এমনকি অভিযুক্ত আসিফ মাহমুদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে তলব করা হয়নি। তদন্তের এই ধীরগতি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শুধু আসিফ মাহমুদ একা নন, ইউনুস সরকারের অন্তত সাতজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গত দুই বছরের মধ্যে বিদেশে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন,

১) ইউনুস সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে দুটি বাড়ি কিনেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই দুটি বাড়ি কেনা হয়েছে ২০২৫ সালে।

২) সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী দুবাইয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। রিজওয়ানার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই ফ্ল্যাট কেনেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩) আদিলুর রহমান খান গত বছরের জুলাইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার স্ত্রীর নামে বাড়ি কিনেছেন বলে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

৪) নুরজাহান বেগম গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি বাড়ি কিনেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

৫) আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দুবাইয়ে অন্তত তিনটি ফ্ল্যাট এবং দোকান কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

৬) মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দুবাইয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে দুদকে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

৭) আলী রীয়াজের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ি ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ দুদকে জমা পড়লেও এখনো এদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি দুদক।

এর আগে বিটিসিএলের ফাইভ-জি উপযোগীকরণ প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং দুদকের তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অনুসন্ধানে ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু মামলার সিদ্ধান্তের সাত মাস পরও এখন পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়নি। ইউনুস সরকারের বিদায়ের আগেই ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দেশত্যাগ করেন।

আসিফ মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব এবং তথ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দুদক। এই অভিযোগ তদন্তেরও কোনো অগ্রগতি নেই। আসিফ মাহমুদের সহকারী একান্ত সচিব এখন দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। আসিফ মাহমুদের অবৈধ সম্পদ তিনি দেখাশোনা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইউনুসের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এসব অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে কেন নীরব, তা নিয়ে ইতিমধ্যে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দুর্নীতি এবং অর্থপাচারেও ইউনুস এবং তার সহযোগীরা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সম্প্রতি একটি খবরে ইউনুস সরকারের দেড় বছরে অর্থপাচার আর লুটপাটের এক অবিশ্বাস্য চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।

গত জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের অনিয়মের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ডও দুদকের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী রাশেদ আহমেদও ইউনুসের দুর্নীতির তদন্ত দাবি করেছেন।

সরকার যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন ইউনুস গংয়ের দুর্নীতির তদন্ত চাইছেন, তখন ইউনুস সরকারের দুর্নীতির তদন্তে বাধা কোথায়? কেন এই তদন্তে ধীরগতি?

সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে ইউনুস গংয়ের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি। ইউনুসের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হলেই দেশে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। এই পদক্ষেপ হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ের পথ।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার

ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন