EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

নারীর সক্ষমতা বনাম সমাজের ধারণা

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

নারীর সক্ষমতা বনাম সমাজের ধারণা

ছবি: লেখক

অ অ

নারীর সক্ষমতার প্রশ্নটি নারীর একার প্রশ্ন নয়। একটি সমাজ কতটা এগোবে, তার অর্থনীতি কতটা সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। চিকিৎসা, বিজ্ঞান, ব্যবসা, প্রশাসন ও রাজনীতিতে নারীরা বারবার নিজেদের যোগ্যতা দেখিয়েছেন। তবু একজন নারী কোন পথে যাবেন, অনেক সময় তা ঠিক করে দেয় সমাজের পুরোনো ধারণা।

একজন নারীর যোগ্যতা মাপার কথা তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রম দিয়ে। বাস্তবে সেই মূল্যায়নে ঢুকে পড়ে তাঁর পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা আর পরিবারে তাঁর ভূমিকা। ফলে একই জায়গায় পৌঁছাতে অনেক নারীকে পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে বেশি খাটতে হয়।

ছোটবেলার শিক্ষা

নারীর প্রতি বৈষম্য সবসময় চোখে পড়ে না। এর শুরু হয় ঘরের ছোট ছোট প্রত্যাশা থেকে। মেয়েদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় কীভাবে কথা বলতে হবে, কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানায়, কোন পেশা তাদের জন্য ‘উপযুক্ত’। ছেলেদের বেলায় নেতৃত্ব, প্রতিযোগিতা আর ঝুঁকি নেওয়াকে সাধারণত উৎসাহ দেওয়া হয়।

এই পার্থক্য ধীরে ধীরে একটি মেয়ের আত্মপরিচয়ে ছাপ ফেলে। একসময় সমাজের ‘তুমি পারবে না’ কথাটা তার নিজের মনের কথা হয়ে যায়। তাই নারীর ক্ষমতায়নে দুটি কাজ একসঙ্গে করতে হয়। বাইরের বাধা সরাতে হয়, আবার নারীর নিজের সক্ষমতায় আস্থাও গড়ে তুলতে হয়।

আত্মসন্দেহ

নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় একটি অদৃশ্য বাধা আত্মসন্দেহ। ধরা যাক, একটি মেয়ে বারবার শুনেছে যে অমুক পেশা তার জন্য নয়, নেতৃত্ব তাকে মানায় না। সে এটাও জানে, ব্যর্থ হলে তাকে বেশি কঠোরভাবে বিচার করা হবে। এমন মেয়ে সুযোগ আসার আগেই নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকে: ‘আমি কি পারব?’ ‘লোকে কী বলবে?’

এই প্রশ্নগুলোকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা ভাবা ভুল। বহু ক্ষেত্রে এগুলো বছরের পর বছর ধরে পাওয়া সামাজিক শিক্ষার ফল। তাই কাউকে শুধু ‘আত্মবিশ্বাসী হও’ বললে কাজ হয় না। এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে ভুল করা, শেখা, নেতৃত্ব দেওয়া আর মত প্রকাশের সুযোগ মেয়ে ও ছেলে সমানভাবে পায়।

পরিবারের ভূমিকা

নারীর জীবনে প্রথম প্রভাবটা আসে পরিবার থেকে। পরিবার যদি মেয়ের স্বপ্নকে বাড়তি বিলাসিতা মনে করে, তার সম্ভাবনা শুরুতেই আটকে যায়। আবার পরিবার যদি পড়াশোনা, পেশা আর ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেয়, সেই মেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারে।

পরিবারের সমর্থন জরুরি, তবে সেখানেই থামলে চলবে না। নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেবেন, এটাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে। জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাঁকে অনুমতির অপেক্ষায় রাখার কোনো যুক্তি নেই। তিনি একজন পূর্ণ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল মানুষ।

কর্মক্ষেত্রে মূল্যায়ন

এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীর সংখ্যা বাড়ছিল। কিন্তু বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ বলছে, এক বছরে এই সংখ্যা ২ কোটি ৫৩ লাখ থেকে নেমে ২ কোটি ৩৭ লাখ হয়েছে। নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি এমনিতেই কম। দক্ষতার ঘাটতি দিয়ে এর ব্যাখ্যা হয় না। সামাজিক প্রত্যাশা, অফিসের সংস্কৃতি, নিরাপত্তার অভাব, ঘরের কাজের অসম ভাগ আর অবচেতন পক্ষপাত, সবই এখানে ভূমিকা রাখে।

একজন নারী দৃঢ়ভাবে নিজের মত দিলে তাঁকে অনেক সময় ‘বেশি কড়া’ বা ‘জেদি’ বলা হয়। পুরুষ একই আচরণ করলে সেটা নেতৃত্বের গুণ হিসেবে প্রশংসা পায়। এই দ্বৈত মানদণ্ড বদলাতে হবে। নারীর দরকার ন্যায্য সুযোগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ আর যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন।

নেতৃত্বে নারী

নেতৃত্বে নারী থাকলে নীতি তৈরির সময় দেশের অর্ধেক মানুষের অভিজ্ঞতা হিসাবে আসে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, প্রযুক্তি বা সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিটি খাতে নারীর অভিজ্ঞতার আলাদা মূল্য আছে। ফলে নারী নেতৃত্বের সুফল পুরো সমাজই পায়। এ কারণে লিঙ্গসমতাকে মানব উন্নয়নের প্রশ্ন হিসেবেই দেখা উচিত।

সমাজের দায়

নারীকে আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, এ কথা ঠিক। কিন্তু পরিবর্তনের পুরো দায় নারীর ঘাড়ে চাপালে চলবে না। নারী নিজের স্বপ্নের জন্য লড়বেন। সমাজের দায়িত্ব হলো সেই স্বপ্নকে অস্বাভাবিক চোখে না দেখা। ক্ষমতায়নের ভিত্তি কয়েকটি মৌলিক বিষয়: শিক্ষায় সমান সুযোগ, নিরাপদ ও ন্যায্য কর্মক্ষেত্র, প্রযুক্তি শেখার সুযোগ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ।

দৃষ্টিভঙ্গির বদল

প্রতিটি নারীকে বারবার প্রমাণ দিতে হবে যে তিনি পারেন, এমনটা হওয়া উচিত নয়। সক্ষমতার বিচার লিঙ্গ দেখে হওয়ার কথা নয়। নারী চিকিৎসকের বিচার হবে তাঁর চিকিৎসা দিয়ে, নারী বিজ্ঞানীর বিচার তাঁর গবেষণা দিয়ে। নারী পরিচয় যেন কারও যোগ্যতার আগে এসে না দাঁড়ায়।

শেষ কথা

নারীকে এগিয়ে নিলে পুরুষ পিছিয়ে পড়েন না। সমতার লক্ষ্য হলো প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের সক্ষমতা বিকাশের ন্যায্য সুযোগ পান। সমাজ যখন একজন নারীর স্বপ্নকে ছোট করে দেখে, তখন ক্ষতিটা সমাজেরও।

তাই নারীর সুরক্ষার পাশাপাশি তাঁর স্বাধীনতা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে যোগ্যতা। একজন নারী নিজের সক্ষমতায় আস্থা রাখতে শিখলে এবং সমাজ তাঁর পথে দেয়াল তোলা বন্ধ করলে, সেই অগ্রগতি গোটা দেশের অগ্রগতিতে গিয়ে মেলে।

লেখক: ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংক ট্যাংক

আরও পড়ুন