আমরা গর্ব করে বলি ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি। নিজেদের দেশকে সেরা বললেও বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর একটি। বিশ্বের সেরা বাদাবন সুন্দরবনের বাঘ ও চিত্রল হরিণের আকর্ষণে পর্যটকরা সাড়া দিতে চান না। কক্সবাজার বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে দেখা যায় না বিদেশি পর্যটকদের ভিড়। নয়নাভিরাম পার্বত্য তিন জেলা, সিলেট ও হাওড়-বাঁওড় পর্যটক আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। জিডিপিতে বিশ্বের ১৮৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। এ ব্যর্থতার কারণ পর্যটনবান্ধব সুযোগসুবিধার অভাব। মধ্যপ্রাচ্যের মরু ধূসর ক্ষুদ্র দেশ বাহরাইনের সাফল্যও এ ক্ষেত্রে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের বাংলাদেশকে লজ্জা দেওয়ার মতো।
পৃথিবীটা বড়ই আজব। কত কিছুই না দেখার আছে, জানার আছে। আমরা তার কতটুকুই বা জানি, চিনি!!! তাই তো রবিঠাকুর বলেছেন, ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকুই-বা জানি,
দেশে দেশে কত-না নগর, রাজধানী,
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে।’
চাকরির সুবাদে এমনি এক অজানা-অচেনা দেশ বাহরাইনে যাওয়ার সুযোগ ঘটে আমার। রেমিট্যান্স আহরণের জন্য খুব সম্ভাবনাময় একটি দেশ। বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। তবে অদক্ষ বা বা আধা দক্ষ বলে তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারছেন না। ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এমনকি নেপালিদের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছেন। ফলে কনস্ট্রাকশনের কাজেই বেশি নিয়োজিত, যেখানে রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি। বেতনভাতাও কম। তাঁদের এ মানবেতর কষ্টের জীবন নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
বাহরাইনের সব কর্মক্ষেত্রেই ভারতীয়দের আধিপত্য। কারণ তাদের বেশির ভাগ লোকই যেকোনো বিষয়ে দক্ষ এবং শিক্ষিত। তুলনামূলকভাবে যারা কম শিক্ষিত তারাও ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। ফলে চাকরির ক্ষেত্রে তারাই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইন ছোট্ট একটি রাষ্ট্র। লোকসংখ্যা মাত্র ১৪ লাখ। তন্মধ্যে ৪০ শতাংশ প্রবাসী শ্রমিক। রাজধানী মানামা। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। মধ্যপ্রাচ্যের মান অনুযায়ী বাহরাইনে তেল উৎপাদন কম হলেও সৌদি আরব থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে দেশটি ধনী দেশে পরিণত হয়েছে। একসময় দেশটির বড় কোনো সম্পদ বা ভিত্তি ছিল না। তাদের অর্থনীতি এবং জীবিকা সম্পূর্ণভাবে মাছ ধরা ও মুক্তা শিকারের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ওই সময়টায় বাহরাইনি পুরুষ মানুষগুলো সমুদ্রে মাছ ধরা এবং মুক্তা খোঁজার কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকত। উল্লেখ্য তখন বাহরাইনের মুক্তা ছিল বিশ্বখ্যাত। এটিই ছিল তখন দেশটির আয়ের প্রধান উৎস। জেলে এবং ডুবুরিরা কাঠের ঐতিহ্যবাহী নৌকা নিয়ে মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটাতেন।
তারা কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই সাগরের তলদেশে গিয়ে মুক্তা সংগ্রহ করতেন, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরে অবশ্য খনিজ তেল পাওয়ার পর বাহরাইনিদের এই পেশা বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাহরাইনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মাছ ধরা এবং মুক্তা খোঁজা। মূলত এটিই তাদের জেলে জীবনের একটি অংশ। বর্তমানে বাহরাইন একটি আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্র হলেও তারা তাদের জেলে বা মুক্তা শিকারি পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে। বাহরাইনিদের ধনী হওয়ার পেছনে সৌদি আরবের অবদান অনস্বীকার্য। বাহরাইন এবং সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক সব সময়ই সুদৃঢ় ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ। এই দীর্ঘস্থায়ী গভীর সম্পর্কের অন্যতম কারণ হলো, এই দেশ দুটি শুধু যে একে অপরের প্রতিবেশী তাই নয়, ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ কিং ফাহাদ কজওয়ে ব্রিজ দ্বারা সরাসরি সংযুক্তও বটে। যার ফলে এটি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিদিন ট্রাকে করে সৌদি আরব থেকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাহরাইনে আসে, যা তাদের বাজারকে সচল রাখে। এ ছাড়া বাহরাইনের অর্থনীতি বিশেষ করে তেল পরিশোধন এবং পর্যটন খাতে সৌদি আরবের রয়েছে বিশাল বিনিয়োগ। অর্থাৎ সৌদি আরব বাহরাইনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। যখনই বিশ্বের কোনো খারাপ দেশকে নিয়ে কথা ওঠে তখনই আমাদের মাথায় আসে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস ও ব্রাজিলের কথা। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়ার পরও বাহরাইন ভোগবাদিতার দিক থেকে ব্যাংকক, লাস ভেগাসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অনেকে দেশটিকে পাপের কারখানাও বলে। অফিশিয়ালি কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের অনুমোদন না থাকলেও রাতের আঁধারে সবই চলে দেদার। দেশটিতে হারাম-হালালের কোনো বালাই নেই। বেশির ভাগ মুসলিম দেশে নেশাজাতীয় দ্রব্য নিষিদ্ধ থাকলেও বাহরাইনে ঠিক তার উল্টো। এমন কোনো হোটেল-মোটেল নেই, যেখানে সুন্দরী কলগার্লের পদচারণ নেই। বেশির ভাগ হোটেলেই রয়েছে মেসেজ পারলার। আবার এই মেসেজ পারলারগুলোর আড়ালেই রয়েছে অনৈতিক ব্যবসা, যা দেশটির প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে।
বিনোদনের সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে বিধায় দিনদিন পর্যটকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাহরাইনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরবের ধনাঢ্য যুবকদের আনাগোনাই বেশি লক্ষণীয়। এ রাজতন্ত্রের দেশে ইসলামের কঠোর অনুশাসন থাকলেও পাশাপাশি রয়েছে পশ্চিমা দেশের অনুকরণে নাইট ক্লাব, বার, ডিসকো ক্লাব যেখানে সুন্দরীদের ভিড় থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিত্তবান যুবকরা হলিডে উপলক্ষে আমোদফুর্তি করার জন্য বেশি ভিড় জমায়। তখন কোনো হোটেলে থাকে না তিলধারণের ঠাঁই। অনেকেই আবার আনন্দ উপভোগের জন্য আগে থেকেই মাসিক ভিত্তিতে প্রমোদ হাউস ভাড়া নিয়ে রাখেন, যাতে হোটেল বুকিংয়ের ঝামেলা না হয়। বেশির ভাগ বাহরাইনি আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসে অভ্যস্ত। সম্পদশালী হওয়ায় একাধিক স্ত্রী থাকা কোনো ব্যাপার নয়। শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে থাকলেও এখনো তারা মেয়েদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করে। ও দেশের মেয়েরা ঘরের বাইরে হিজাব বা বোরকা পরে চলাফেরা করলেও প্রায় সবাই বোরকার নিচে স্কার্ট পরে। অর্থাৎ পর্দার আড়ালে তারা পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবান্বিত। সৌদি আরব ও বাহরাইনের মধ্যে স্থলপথে যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। বিশেষ করে কিং ফাহাদ কজওয়ে ব্রিজ দেশ দুটিকে সংযুক্ত করাতে আরও সুবিধা হয়েছে। নারী, মদ, অ্যালকোহল ও জুয়ার জন্য সৌদিবাসীর কাছে বাহরাইন খুব পছন্দের জায়গা। সৌদি আরব থেকে এখানে এসে তারা রাতভর মদপান করে এবং মদ্যপ অবস্থায় ফেরার পথে কজওয়ে ব্রিজে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। এ কারণে কিং ফাহাদ কজওয়ে ব্রিজটি ‘ব্লাড বর্ডার’ নামে পরিচিত।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখনো বহু লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আজ প্রবাসের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। বর্তমানে বাহরাইনে প্রায় ৮ হাজার নারী হাউসমেইড হিসেবে কর্মরত। বাহরাইনিরা একাধিক নারী ভোগে অভ্যস্ত বিধায় এসব হাউসমেইডের অনেকে ক্রমে ক্রমে তাদের লালসার শিকার হন। পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে এদের অনেকেই আবার নাইট ক্লাব বা হোটেলে দেহব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি বাহরাইনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য লজ্জাজনক হলেও এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েও লাভ হয়নি। কারণ যাদের আশ্রয়ে তারা এ অনৈতিক কাজগুলো করে থাকে তারা ও দেশের মাফিয়া চক্রের লোক। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো বাহরাইনেও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী কর্মী কর্মরত, যারা মূলত গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, তৈরি পোশাক খাত এবং বিভিন্ন সেবা খাতে কাজ করছেন। যদিও পুরুষ কর্মীদের তুলনায় তাদের গড় আয় কম, তবু তারা নিয়মিত এবং সততার সঙ্গে তাদের উপার্জিত অর্থের সিংহভাগ বৈধ ও অবৈধ চ্যানেলে দেশে পাঠান। হাউসমেইডরা অনেক সময় প্রথাগত ব্যাংকিংব্যবস্থা সম্পর্কে কম জানেন বা তাদের ছুটি কম থাকে। ফলে তারা অনেক সময় স্থানীয় দালাল বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম (হুন্ডি) ব্যবহার করে দেশে টাকা পাঠাতে বাধ্য হন। মোদ্দা কথা বাহরাইন থেকে নারী কর্মীদের রেমিট্যান্স প্রেরণ দেশের অর্থনীতিতে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, তা আজ অনস্বীকার্য। বাহরাইনের যিনি রাজা, তার নাম হামাদ বিন ইসা আল খলিফা। বসবাসের জন্য প্যালেস রয়েছে ১২টি। সেগুলো কোথায়, তা কেউ জানে না। কোনো কোনোটি মরুভূমির মধ্যেও অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়। তিনি কখন কোন প্যালেসে থাকবেন-এ ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।
ও দেশের যে জিনিসটি দেখে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছি তা হলো, ধু-ধু মরুভূমির ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল রহস্যময় গাছ যা বছরের পর বছর ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাছটি ‘ট্রি অব লাইফ’ নামে খ্যাত। দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি। কোথাও এতটুকু মাটি বা পানির চিহ্ন নেই। অথচ গাছটি দিব্যি বেঁচে আছে। শুধু কি তা-ই? এর বয়সও নাকি ৪০০ বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ কোনো পরিবর্তন নেই। একই রকম রয়ে গেছে। পানিশূন্য মরুভূমিতে কী করে গাছটি এত বছর বেঁচে আছে, তা এক রহস্যই বটে। খটখটে মরুভূমির বুকে বৃষ্টিহীন পরিবেশে এতে নিয়মিত পাতা গজাচ্ছে। কী অদ্ভুত, অলৌকিক ব্যাপার!!! এই দৃশ্য যুগ যুগ ধরে মানুষকে বিস্মিত করে আসছে। প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থী ও পর্যটক গাছটি দেখতে ভিড় করেন। বাহরাইনে বাংলাদেশের জন্য একটি চমৎকার জনশক্তি রপ্তানির বাজার গড়ে উঠছে। দেশটিতে প্রাচুর্যের অভাব নেই বিধায় রাস্তাঘাট ও দালানকোঠা নির্মাণসহ আরও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রতিদিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। জনশক্তি রপ্তানির এ সম্ভাবনাময় বাজারের প্রতি আমাদের আরও যত্নবান হওয়া বাঞ্ছনীয়। পর্যটন ক্ষেত্রে বাহরাইন এগিয়ে যাওয়া দেশ। বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হলে পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীতে অন্য সব দেশ পর্যটন ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারলে আমরা কেন পারব না।
লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক