নারী নেতৃত্ব: রাজনীতিকে ভয় নয়, পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
নারী নেতৃত্ব নিয়ে কথা উঠলেই আমরা প্রায়ই “নারীর ক্ষমতায়ন” শব্দটি ব্যবহার করি। শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিষয়টি তার চেয়েও বড়। নারী নেতৃত্ব মানে কেবল কয়েকজন নারীকে দৃশ্যমান পদে বসানো নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর কণ্ঠ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব গুরুত্ব দেওয়া।
কারণ রাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি নীতিনির্ধারণের টেবিলে সমানভাবে উপস্থিত না থাকে, তাহলে সেই টেবিলের সিদ্ধান্তও সমাজের পুরো বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, ব্যবসা, প্রশাসন, বিচার, কূটনীতি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তবু রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে তাদের উপস্থিতি এখনো সেই অনুপাতে পৌঁছায়নি।
IPU–UN Women-এর Women in Politics: 2026 তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে জাতীয় সংসদের আসনের ২৭.৫ শতাংশ এবং মন্ত্রিসভার ২২.৪ শতাংশ নারীদের দখলে। বাংলাদেশে IPU-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ১৬.৩৮ শতাংশ। সংখ্যাগুলো আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়—নারী নেতৃত্বের অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু সমতার পথ এখনো অনেক দূর।
এখানে একটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে—রাজনীতি কি সত্যিই নারীদের জন্য নিরাপদ বা উপযুক্ত জায়গা?
প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়। রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা আছে, কঠিন বিরোধ আছে, অপপ্রচার আছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ আছে। নারীদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত হয় আরও একটি স্তর—চেহারা, পোশাক, পরিবার, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য। একজন পুরুষ রাজনীতিকের নীতি নিয়ে তর্ক হতে পারে; একজন নারী রাজনীতিকের ক্ষেত্রে তর্কটি খুব দ্রুত তার ব্যক্তিগত পরিচয়ে নেমে যেতে পারে।
এই বাস্তবতাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত IPU-এর এশিয়া-প্যাসিফিক গবেষণায় জরিপে অংশ নেওয়া নারী সংসদ সদস্যদের ৬০ শতাংশ অনলাইনে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ঘৃণামূলক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর প্রচার, ছবি-ভিত্তিক অপব্যবহার বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন। ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন মানসিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নটি শুধু সুযোগের নয়; নিরাপত্তা ও মর্যাদারও।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—কিছু মানুষের অনৈতিক আচরণ, একটি ব্যবস্থার দুর্বলতা বা একটি সময়ের খারাপ সংস্কৃতির কারণে কি পুরো রাজনীতিকে ছেড়ে দেওয়া উচিত? আমি মনে করি, উত্তরটি না।
একজন চিকিৎসক হিসেবে একটি পরিচিত উদাহরণ মনে আসে। শরীরের কোনো অঙ্গে সংক্রমণ হলে আমরা পুরো শরীরকে পরিত্যাগ করি না। আমরা রোগের কারণ খুঁজি, পরীক্ষা করি, চিকিৎসা দিই, প্রয়োজন হলে ক্ষত পরিষ্কার করি, পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করি। কারণ সমস্যাটি শরীরের অস্তিত্ব নয়; সমস্যাটি তার ভেতরের অসুস্থতা।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন। রাজনীতি নিজে নৈতিক বা অনৈতিক নয়। রাজনীতি হলো সমাজ পরিচালনার একটি প্রক্রিয়া—যেখানে বাজেট নির্ধারিত হয়, আইন তৈরি হয়, হাসপাতাল কোথায় হবে তা ঠিক হয়, শিক্ষা কতটা সুলভ হবে তা নির্ধারিত হয়, নারীর নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শিশুর পুষ্টি পর্যন্ত অসংখ্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই জায়গাটি যদি অসুস্থ হয়, তাহলে চিকিৎসা দরকার; শূন্য করে দেওয়া নয়।
আর চিকিৎসার একটি বড় অংশ হলো নতুন, যোগ্য ও দায়িত্বশীল মানুষকে সেই জায়গায় আসতে দেওয়া। সেখানে নারীর অংশগ্রহণ কোনো সৌজন্য নয়; প্রয়োজন।
তবে নারী নেতৃত্বের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে একটি ভুলও করা উচিত নয়। একজন নারী নেতা হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো নেতা হয়ে যান না। যেমন একজন পুরুষ নেতা হলেই তিনি যোগ্য হন না। নেতৃত্বের মানদণ্ড হওয়া উচিত সততা, দক্ষতা, জনসেবার মানসিকতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, জবাবদিহি এবং মানুষের প্রতি সম্মান। নারী নেতৃত্বের দাবি আসলে বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; একই মানদণ্ডে সমান সুযোগের দাবি।
এ কারণেই কেবল সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। একজন নারী যদি সভায় থাকেন কিন্তু কথা বলার সুযোগ না পান, পদে থাকেন কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন, প্রার্থী হন কিন্তু সংগঠনের সম্পদ ও সমর্থনে বৈষম্যের শিকার হন—তাহলে উপস্থিতি আছে, নেতৃত্ব নেই।
সংরক্ষিত আসন, কোটা বা বিশেষ ব্যবস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে দরজা খুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে নারীকে “নারী প্রার্থী” হিসেবে আলাদা করে ব্যাখ্যা করতে হবে না; তিনি যোগ্য প্রার্থী বলেই মূল্যায়িত হবেন।
নারীর অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশ্নের উত্তরও খুব বাস্তব। নিরাপদ গণপরিবহন, মাতৃস্বাস্থ্য, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শিশু পরিচর্যা, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যালয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা—এসব বিষয় পুরুষও বুঝতে পারেন এবং নীতি তৈরি করতে পারেন। কিন্তু যাদের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমস্যাগুলো সরাসরি যুক্ত, তাদের কণ্ঠ সিদ্ধান্তের টেবিলে থাকলে নীতি আরও সম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
একটি সংসদ, মন্ত্রিসভা, স্থানীয় সরকার বা রাজনৈতিক কমিটি তখনই সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল হয়, যখন সেখানে সমাজের বৈচিত্র্য শুধু ছবিতে নয়, সিদ্ধান্তেও প্রতিফলিত হয়।
এখানে দায়িত্ব শুধু নারীর নয়। আমরা অনেক সময় বলি, “নারীদের সাহসী হতে হবে।” কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু একজন নারীকে প্রতিদিন অপমান, চরিত্রহনন, অনলাইন হুমকি বা যৌন হয়রানি সহ্য করে সাহস প্রমাণ করতে হবে—এমন পরিবেশকে স্বাভাবিক বলা যায় না। সাহসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকেও নিরাপদ হতে হবে।
রাজনৈতিক দল ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে স্পষ্ট আচরণবিধি দরকার। হয়রানির অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা দরকার। ডিজিটাল অপমান ও হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দরকার। প্রার্থী বাছাই ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা দরকার। তরুণ নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, নীতিনির্ধারণ বোঝার সুযোগ, জনসমক্ষে কথা বলা, সংগঠন পরিচালনা এবং অভিজ্ঞ নেতাদের কাছ থেকে mentorship-এর সুযোগ দরকার। প্রয়োজন একটি খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন—নারীর কাজকে তার কাজ দিয়ে বিচার করা। তার পোশাক, বৈবাহিক অবস্থা, পরিবার বা ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে নয়।
নারী নেতৃত্ব নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, এটি যেন পুরুষের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিযোগিতা। আমি বিষয়টিকে সেভাবে দেখি না। একজন নারী এগিয়ে গেলে একজন পুরুষের অধিকার কমে যায় না। বরং একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার পরিসর বড় হয়। ভালো নেতৃত্বের জন্য নারী ও পুরুষ—দুজনেরই প্রয়োজন, এবং দুজনেরই একে অন্যের সহযোদ্ধা হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে পুরুষ সহকর্মীদের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সভায় একজন নারীকে বারবার থামিয়ে দেওয়া হলে পাশে থাকা পুরুষ সহকর্মীর নীরবতাও একটি বার্তা দেয়। আবার তিনি যদি বলেন, “তার কথা শেষ করতে দিন”, সেটিও একটি বার্তা দেয়। সংস্কৃতি শুধু নীতিমালা দিয়ে বদলায় না; প্রতিদিনের ছোট আচরণেও বদলায়।
পরিবারের ভূমিকাও কম নয়। আমরা ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব নিতে উৎসাহ দিই; মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেক পরিবার এখনো প্রথমে নিরাপত্তা, সমাজ কী বলবে, রাত করে ফিরবে কি না—এসব ভাবতে বাধ্য হয়। উদ্বেগের বাস্তব কারণ আছে। কিন্তু সমাধান যদি হয় মেয়েকে জনজীবন থেকে সরিয়ে রাখা, তাহলে অসুরক্ষিত জায়গাগুলো কখনো নিরাপদ হবে না। আমাদের বরং এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন তরুণী রাজনীতি, সামাজিক কাজ, স্থানীয় সমস্যা সমাধান, ছাত্রসংগঠন, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ বা নাগরিক উদ্যোগে অংশ নিলে পরিবার তাকে শুধু “ঝুঁকি নিচ্ছে” বলে দেখবে না; “দায়িত্ব নিচ্ছে” বলেও দেখবে।
রাজনীতিতে ভালো মানুষের প্রয়োজন—এই কথাটি আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু ভালো মানুষ যদি রাজনীতিকে শুধু দূর থেকে সমালোচনা করেন, তাহলে ভেতরের জায়গাগুলো কারা পূরণ করবে? এই প্রশ্নটি নারী-পুরুষ সবার জন্য। তবে নারীর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ একজন নারী যখন জনজীবনে প্রবেশ করেন, তিনি শুধু একটি পদ গ্রহণ করেন না। তিনি তার পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েদের কাছে একটি সম্ভাবনা দৃশ্যমান করেন—এই জায়গাটিও আমার হতে পারে, এই সিদ্ধান্তটিও আমি নিতে পারি, এই প্রশ্নটিও আমি করতে পারি।
আমাদের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের উদাহরণ আছে, আবার নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা ও অবমূল্যায়নের উদাহরণও আছে। শুধু অতীতের সাফল্য দেখিয়ে বর্তমানের সমস্যা ঢেকে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বর্তমানের সমস্যা দেখে ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ করাও ঠিক নয়।
এ কারণেই নারী নেতৃত্বের আলোচনা আবেগের চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। দরকার প্রতিষ্ঠান সংস্কার, নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন, রাজনৈতিক শিক্ষা, আর্থিক ও সাংগঠনিক সুযোগ, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং জবাবদিহি। রাজনীতির সবকিছু সুন্দর নয়—এটি সত্য। ক্ষমতার অপব্যবহার আছে, অসহিষ্ণুতা আছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ আছে, নারীবিদ্বেষী আচরণও আছে। এসবের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান দরকার। কিন্তু সমস্যার অস্তিত্বই পরিবর্তনের প্রয়োজনকে আরও স্পষ্ট করে। রাজনীতিকে ভয় পেয়ে দূরে সরে গেলে রাজনীতি আমাদের জীবন থেকে দূরে যায় না। তার সিদ্ধান্ত তবু আমাদের হাসপাতাল, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, বাজার, পরিবার এবং ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে।
তাই আমার কাছে প্রশ্নটি “নারীরা রাজনীতিতে আসবে কি না” নয়। প্রশ্নটি হলো—কীভাবে এমন রাজনীতি তৈরি করা যায়, যেখানে একজন যোগ্য নারী নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারেন। ভয় নয়, প্রস্তুতি। নীরবতা নয়, অংশগ্রহণ। প্রতীকী উপস্থিতি নয়, সিদ্ধান্তের ক্ষমতা। নারী বনাম পুরুষ নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে সহযোগিতা।
সকারণ নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় নারী বা পুরুষ নয়। নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় তার চরিত্র, যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা। আর যে সমাজ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যথাযথভাবে পৌঁছাতে দেয় না, সে সমাজ শুধু নারীদেরই পিছিয়ে রাখে না—নিজের সম্ভাবনারও একটি বড় অংশকে বাইরে রেখে দেয়।
লেখক: ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল ও সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংক ট্যাংক (BYTT)