বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশ্ন করার সুযোগ, নিজের চিন্তা প্রকাশের পরিবেশ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চর্চা। শিক্ষার্থীরা যখন নিজেরাই কোনো প্রকল্পের ধারণা তৈরি করে, গবেষণার বিষয় নিয়ে ভাবে কিংবা একটি রোবট তৈরি করে তার সক্ষমতা পরীক্ষা করে। তখন বিজ্ঞান তাদের কাছে আর শুধু পরীক্ষার বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে অনুসন্ধান ও সৃষ্টির মাধ্যম। এমন একটি পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) শুরু হয়েছে ‘৪র্থ নোবিপ্রবি ন্যাশনাল সায়েন্স ফেস্ট-২০২৬’।
নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাবের উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের উদ্বোধন হয়েছে আজ ৩ অক্টোবর। র্যালির মাধ্যমে ফেস্টের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী। এবারের আয়োজনে নোবিপ্রবিসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৩৮টি স্কুল-কলেজ ও ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষার্থীদের গণ্ডি পেরিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক এ আয়োজন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো শিক্ষার্থীদের নিজেদের চিন্তা ও সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক একটি বিষয় ব্যাখ্যা করেন, শিক্ষার্থী তা শেখে। কিন্তু বিজ্ঞান উৎসবে শিক্ষার্থীকে নিজেকেই ভাবতে হয়-কোন সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ, তার সমাধান কী হতে পারে এবং সেই সমাধান কীভাবে বাস্তবে উপস্থাপন করা যায়। এই প্রক্রিয়াই একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে গবেষণামনস্কতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
নোবিপ্রবি সায়েন্স ফেস্টের আয়োজনেও সেই সুযোগ রাখা হয়েছে। মোট নয়টি সেগমেন্টে সাজানো হয়েছে প্রতিযোগিতা। জাতীয় পর্যায়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে পোস্টার প্রেজেন্টেশন, ‘থ্রি মিনিটস রিসার্চ আইডিয়া প্রেজেন্টেশন’ এবং রোবট লাইন রেস কম্পিটিশন। নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট, ই-স্পোর্টস ও ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে প্রজেক্ট শোকেজ ও সায়েন্স অলিম্পিয়াড।
এই আয়োজনের একটি বিশেষ দিক হলো একই প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন শিক্ষাস্তরের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ। স্কুলের একজন শিক্ষার্থী যেখানে নিজের প্রকল্প নিয়ে হাজির হচ্ছে, একই উৎসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সেখানে গবেষণার ধারণা উপস্থাপন করছে। ফলে বিজ্ঞানচর্চার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে। মাধ্যমিক বয়সে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা এবং পরবর্তী সময়ে সেই আগ্রহকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে নোয়াখালী অঞ্চলের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে এসে এমন একটি আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আলাদা গুরুত্ব বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তারা নিজেদের ধারণা অন্যদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। সায়েন্স ফেস্টের এই বিস্তৃত অংশগ্রহণকে শুধু প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে এর একটি বড় সম্ভাবনা অনালোচিত থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাডেমিক ও জ্ঞানভিত্তিক যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও এমন আয়োজন ভূমিকা রাখতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন শুধু নিজের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান থাকে না; আশপাশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এই বিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা নতুন নতুন প্রযুক্তি শিক্ষার ধরন ও গবেষণার ক্ষেত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানীও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের এআইসহ আধুনিক প্রযুক্তিকে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রতিভা বিকাশে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার এ আহ্বান বর্তমান প্রজন্মের বিজ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনে-প্রযুক্তি শুধু ব্যবহারের বিষয় নয়, এর সৃজনশীল প্রয়োগও শিখতে হবে। নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবিপ্রবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামও শিক্ষার্থীদের নিজেদের চিন্তা থেকে প্রকল্প তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, এসব প্রকল্পের ধারণা তৈরির প্রক্রিয়াই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে করবে। অর্থাৎ একটি প্রকল্পের পুরস্কার পাওয়া হয়তো একজন শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক অর্জন; কিন্তু সেই প্রকল্প তৈরির অভিজ্ঞতা তার দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও গবেষণাজীবনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
নোবিপ্রবি সায়েন্স ক্লাবের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে, করোনার সময়ে। কয়েক বছরের ব্যবধানে সংগঠনটির চতুর্থ জাতীয় সায়েন্স ফেস্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে বুঝা যায়, ক্লাব সংশ্লিষ্টদের নেতৃত্বে বিজ্ঞানভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রমের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতাকে আরও বিস্তৃত করা গেলে বিজ্ঞান উৎসবটি ভবিষ্যতে শুধু একটি বার্ষিক প্রতিযোগিতা নয়, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মধ্যে ধারণা বিনিময়ের একটি নিয়মিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, উদ্ভাবন ও বিজ্ঞান যোগাযোগকে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের সঙ্গে যুক্ত করার একটি মাধ্যম হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়মুখী বিজ্ঞানচর্চার একটি সেতু।
বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম তৈরি হয় একদিনে নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চর্চা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং নিজের ধারণাকে পরীক্ষা করার সুযোগ। নোবিপ্রবির সায়েন্স ফেস্ট সেই চর্চার একটি মঞ্চ তৈরি করেছে। এখন এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে-দুই দিনের উৎসব শেষে শিক্ষার্থীদের হাতে যদি কেবল পুরস্কার নয়, নতুন কোনো প্রশ্ন, নতুন কোনো গবেষণার ধারণা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন কোনো স্বপ্ন গেঁথে দেওয়া যায়।
লেখক: সহকারী পরিচালক (তথ্য ও জনসংযোগ) নোবিপ্রবি