জিল্লুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
এক সপ্তাহে চারটি ছবি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ছবিতে বৃদ্ধ মা-বাবা-সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিয়েও নিজের ঘরে থাকার নিশ্চয়তা খুঁজছেন আইনের কাছে। দ্বিতীয় ছবিতে কক্সবাজারের সমুদ্র আর তার আড়ালে ভাড়া করা অবকাশকেন্দ্রে হাজার হাজার মুঠোফোনের রহস্যময় প্রতারণার কারখানা। তৃতীয় ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-যে আমাদের হয়ে লিখছে, হিসাব করছে, এমনকি ভোটার তালিকা ও নির্বাচন পরিচালনার অদৃশ্য কাঠামোতেও ঢুকে পড়ছে। আর চতুর্থ ছবিতে একজন মানুষের চলে যাওয়া-আমীরুল ইসলাম; যাঁর কণ্ঠ, হাসি ও মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা কোনো যন্ত্রের স্মৃতিভান্ডারে ধরা যাবে না। চারটি বিষয় আলাদা-পরিবার ও আইন, আন্তর্দেশীয় অপরাধ, প্রযুক্তি ও গণতন্ত্র, স্মৃতি ও শূন্যতা। অথচ ভিতরে একই শব্দ ফিরে আসে, বিশ্বাস। সমাজ বিশ্বাসে চলে; রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়, কারণ বিশ্বাস সব সময় রক্ষা পায় না। এই চারটি গল্প যেন আমাদের সেটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
১. ভালোবাসা যখন দলিল চায়
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীতে দাতা নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সন্তান, নাতিনাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি প্রয়োজনীয় ও মানবিক উদ্যোগ। বহু মা-বাবা সারা জীবনের সঞ্চয়ে বাড়ি করেন, পরে আস্থায় সন্তানের নামে লিখে দেন। দলিলের কালি শুকানোর আগেই কখনো সম্পর্কের রং বদলে যায়। যে সন্তান বলেছিল, ‘তোমাদের সব দায়িত্ব আমার’, পরে তার সংসারে মা-বাবার জন্য একটি ঘরও বেশি মনে হয়। তখন ভালোবাসার মৌখিক প্রতিশ্রুতি আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসে না। নতুন আইন অন্তত বলছে, সম্পত্তি দান মানে নিজের জীবনটিও দান করে দেওয়া নয়। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার নিরাপত্তা সন্তানের দয়ার বিষয় নয়, অধিকারের বিষয়। তবে ভালো উদ্দেশ্য আর কার্যকর আইন এক নয়। ‘ভোগাধিকার’ কি শুধু বসবাস, নাকি ভাড়া বা ফসলের আয়ও গ্রহীতা সম্পত্তি বন্ধক রাখলে দাতার সম্মতি লাগবে কি ঋণখেলাপির নিলামেও কি তাঁর অধিকার থাকবে জমি অধিগ্রহণ বা বিমার অর্থে কার কত অংশ সবচেয়ে বড় কথা, সন্তান ঘর থেকে বের করে দিলে বৃদ্ধ মানুষটি কি বছরের পর বছর দেওয়ানি আদালতের বারান্দায় ঘুরবেন জীবনকালীন অধিকারের রায় মৃত্যুর পরে এলে আইনটি তখন শোকবার্তার পাশে রাখা এক টুকরা কাগজ।
তাই দলিল, নামজারি ও খতিয়ানে ভোগাধিকারের তথ্য স্পষ্ট করা দরকার; ভবিষ্যৎ ক্রেতা, ব্যাংক ও ভূমি প্রশাসনকে জানতে হবে সম্পত্তিটির সঙ্গে একজন জীবিত মানুষের অধিকার যুক্ত আছে। দ্রুত অন্তর্বর্তী প্রতিকারের ব্যবস্থাও চাই। সংশোধনীটি প্রচলিত হেবা বাতিল করেনি, একটি অতিরিক্ত দেওয়ানি পথ খুলেছে। কাজেই একে ধর্ম বনাম আইন বিতর্কের কুয়াশায় না ঢেকে প্রয়োগের ফাঁক বন্ধ করাই জরুরি। সন্তানকে নৈতিক করা আইনের সাধ্য নেই, কিন্তু অনৈতিকতার খরচ বাড়ানো আইনের দায়িত্ব।
২. সমুদ্রের ধারে প্রতারণার কারখানা
পরিবারের সম্পত্তির দলিল স্বচ্ছ না হলে একজন বৃদ্ধ বিপদে পড়েন। আর ভাড়া দেওয়া বাড়ি বা হোটেলের ব্যবহার সম্পর্কে রাষ্ট্র অন্ধ থাকলে একটি দেশই বিপদে পড়ে। কক্সবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই সতর্কবার্তা দিয়েছে। মেরিন ড্রাইভের একটি অবকাশকেন্দ্রের হলঘরকে কম্পিউটার কক্ষে পরিণত করা হয়েছিল। সেখান থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি পুরোনো আইফোন, প্রায় ৫০টি পর্দা, ৪৪টি কম্পিউটারের মূল যন্ত্রাংশসহ বিপুল সরঞ্জাম ও শব্দরোধী কক্ষ পাওয়া যায়। পরে পাঁচজন চীনা ও একজন তাইওয়ানি নাগরিক গ্রেপ্তার হন। তদন্তকারীরা অনলাইন জুয়া, ভুয়া বিনিয়োগমঞ্চ ও টাকা নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া ধরনের প্রতারণার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। যন্ত্রপরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঠিক নয়, কিন্তু বিপদের আকারটি ছোট নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয়, আয়োজনটি একটি ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল না। একাধিক হোটেল, অবকাশকেন্দ্র ও আবাসিক ভবনের যোগসূত্র মিলেছে; বহু বিদেশি নাগরিক কয়েক মাস ধরে সেখানে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথম অভিযানে অনেকে সৈকত দিয়ে পালিয়েও যান। বিদেশি অতিথিদের পাসপোর্ট-ভিসার তথ্য কর্তৃপক্ষকে না জানানো এবং এত মানুষ ও সরঞ্জামের যাতায়াত দীর্ঘ সময় নজরে না পড়া-এসব প্রশ্ন পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, হোটেল মালিক, আর্থিক গোয়েন্দা ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ-সবার।
কয়েকজন চীনা নাগরিকের অপরাধ মানে চীনকে অভিযুক্ত করা নয়; অপরাধীর পাসপোর্ট থাকতে পারে, সম্মানজনক জাতীয়তা নেই। আবার বিদেশিদের ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে স্থানীয় সহযোগীদের আড়াল করাও আত্মপ্রবঞ্চনা। থাকাখাওয়া, বাড়িভাড়া, যন্ত্র আনা, যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেন-স্থানীয় সহায়তা ছাড়া দীর্ঘদিন চলা কঠিন। আমাদের দেশে অনেক অপরাধ বিদেশ থেকে আসে না; বিদেশি অপরাধ কড়া নাড়লে ভিতর থেকে কেউ দরজা খুলে দেয়।
কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের বড় প্রতারণাকেন্দ্রে চাপ বাড়ায় চক্রগুলো ছোট দলে নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ এখনই আঞ্চলিক প্রতারণার ঘাঁটি, এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু সহজে ভাড়া পাওয়া স্থাপনা, দুর্বল পরিচয় যাচাই, সীমিত সাইবার তদন্তক্ষমতা ও স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী যে ঝুঁকি তৈরি করেছে, কক্সবাজার তা দেখিয়েছে। এখনই সমন্বিত তদন্ত, অর্থের পথ অনুসরণ এবং সম্ভাব্য মানব পাচারের শিকারদের আলাদা করে শনাক্ত করা দরকার। কারণ এমন অনেক কেন্দ্রে চাকরির প্রলোভনে আনা মানুষকেও জোর করে প্রতারণায় ব্যবহার করা হয়।
৩. ভোটের বাক্সে অদৃশ্য যন্ত্র
কক্সবাজারে হাজারো ফোন দিয়ে ভুয়া পরিচয় চালানো হলে আমরা সেটিকে অপরাধ বলি। কিন্তু কোনো অস্বচ্ছ যন্ত্র ভুল করে একজন সত্যিকারের ভোটারকে ‘ভুয়া’ বলে তালিকা থেকে বাদ দিলে সেটিকে কী বলব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় কৃত্রিম ভিডিও, নকল কণ্ঠ আর মিথ্যা প্রচারণাই বেশি জায়গা পায়। দৃশ্যমান ভয় সংবাদে ভালো চলে। অথচ বড় বিপদটি পর্দার আড়ালে-ভোটারতালিকা, পরিচয় যাচাই, জনমিতিক তথ্য, ফল ব্যবস্থাপনা ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত অস্বচ্ছ গণনাপদ্ধতি।
এক সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতে ভোটার পরিচয়পত্রের সঙ্গে আধার তথ্য মিলিয়ে মৃত ও দ্বৈত ভোটার চিহ্নিত করার উদ্যোগে যন্ত্রনির্ভর বাছাইয়ের বিপদ দেখা গেছে। দুই রাজ্যে প্রায় ৫৫ লাখ নাম বাদ পড়েছিল; পরে তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথিতে মিল নির্ধারণের পদ্ধতিটির ব্যর্থতার হার ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত ছিল বলে জানা যায়। এটি শুধু কারিগরি ভুল নয়। ভোটের অধিকার হারালে নাগরিক কার কাছে আপিল করবেন-নির্বাচন কমিশন, যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, নাকি এমন একটি গোপন সূত্রের কাছে, যার যুক্তিই কেউ দেখতে পারে না
বাংলাদেশে নির্বাচনব্যবস্থায় প্রযুক্তি প্রয়োজন, কিন্তু প্রযুক্তিকে নিরপেক্ষতার জাদুর কাঠি ভাবা বিপজ্জনক। আমাদের জানতে হবে ভোটারের তথ্য কোথায় থাকবে, কে ব্যবহার করবে, সরবরাহকারীর পদ্ধতি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা যাবে কি না, ভুল হলে মানুষের পর্যালোচনা থাকবে কি না এবং সিদ্ধান্তের বোধগম্য ব্যাখ্যা মিলবে কি না। উৎস-সংকেত গোপন রেখে গণতন্ত্রের দরজা খোলা রাখা যায় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনা এখন পরীক্ষা থেকে জবাবদিহির পর্যায়ে যাচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সহকারীকে প্রয়োজনের বেশি ক্ষমতা না দেওয়া, প্রতিটি পদক্ষেপের নথি রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমোদন-এসব আর বিলাসিতা নয়। আমলাতন্ত্র হয়তো এমন যন্ত্র পছন্দ করবে, যে বদলির তদবির করে না, সংবাদ সম্মেলন ডাকে না, প্রশ্নও করে না। বিপদ হলো, ভুল হলে একই আমলাতন্ত্র বলবে, ‘সিদ্ধান্ত তো যন্ত্র নিয়েছে।’ কিন্তু যন্ত্রকে ক্ষমতা দিয়েছে মানুষ; দায়ও মানুষের।
শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীলতায়ও শুধু তৈরি জিনিস নয়, তৈরির প্রক্রিয়া এবং নিজের কাজ ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা যাচাই করতে হবে। নইলে কাজের সঙ্গে চিন্তাটিও আমরা বাইরে দিয়ে দেব। যন্ত্রের স্মৃতি অসীম হতে পারে, কিন্তু স্মৃতি আর সম্পর্ক এক নয়। এখানেই আমার চতুর্থ গল্প, আমীরুল ভাই।
৪. আমীরুল ভাই : সম্পর্কের যে উত্তরাধিকার
আমীরুল ইসলামকে আমি চিনতাম কৈশোর থেকে। বয়সে তিনি আমার চেয়ে বড় ছিলেন। আমাদের দুজনেরই বেড়ে ওঠা পুরোনো ঢাকার আলো, বাতাস ও গন্ধে। ঢাকায় আমার জন্ম হলেও আমরা ঢাকাইয়া ছিলাম না। তাই আমীরুল ভাইয়ের মতো ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু তাঁর শব্দের টান ও রসিকতা সব সময় উপভোগ করতাম। তিনি কথা বললে পুরোনো ঢাকার অলিগলি যেন কণ্ঠ পেত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে হাজার পৃষ্ঠা ঢাকাইয়া সংলাপ দিয়ে সেই টান নকল করানো যাবে, কিন্তু তাঁর চোখের দুষ্টুমি আর হাসির উষ্ণতা দেওয়া যাবে কি
আমি যখন জাকসুর সাহিত্য সম্পাদক, তখন একটি প্রকাশনার জন্য তাঁকে লেখা দিতে বলেছিলাম। তিনি ঢাকাইয়া ভাষায় অসাধারণ একটি গল্প লিখে দিয়েছিলেন। সেটি শুধু গল্প ছিল না; একটি শহরের মুখের ভাষাকে ছাপার পাতায় তুলে রাখার কাজও ছিল। আমীরুল ভাই বুঝতেন, শিশুসাহিত্য মানে শিশুদের জন্য বাক্য ছোট করা নয়; পৃথিবীকে অপার বিস্ময়ের চোখে দেখা। ছড়া, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, গণিত, ভ্রমণ, জীবনী-বিচিত্র বিষয়ে তাঁর শত শত বই। ২০০৬ সালে শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কারের তালিকা তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তাঁর বড় পরিচয়, তিনি মানুষকে জুড়তে পারতেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় আমরা চ্যানেল আইয়ে সহকর্মী ছিলাম। আমাদের সবার প্রিয় ফরিদুর রেজা সাগরের আশ্রয়, প্রশ্রয় ও ভালোবাসায় আমীরুল ভাই হয়ে উঠেছিলেন সাগর ভাই এবং বাংলাদেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে অনন্য সেতু। কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, আর কিছু মানুষ প্রতিষ্ঠানকে পরিবারে পরিণত করেন। আমীরুল ভাই ছিলেন দ্বিতীয় দলের।
আমাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তিনি এসেছেন; এক-দুবার বাড়ির ঘরোয়া আড্ডায়ও যোগ দিয়েছেন। এরপর যতবার দেখা হয়েছে, ফাহমিদার হাতের রান্নার প্রশংসা করেছেন, আবার আড্ডা দিতে বলেছেন। আমরা বলেছি, হবে। সময়ও বুঝি ভেবেছে, অনেক দিন পড়ে আছে। কিন্তু সেই আড্ডা আর হলো না। জীবনের সবচেয়ে নির্মম শব্দ সম্ভবত ‘পরে’। কাজ পরে করব, ফোন পরে দেব, আরেক দিন বসব-তারপর হঠাৎ দেখি, দিন আছে, মানুষটি নেই।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর মাত্র ৬২ বছর বয়সে আমীরুল ভাই চলে গেলেন। বাংলা শিশুসাহিত্য হারাল নিবেদিত লেখককে, চ্যানেল আই প্রাণবান সহকর্মীকে, সংস্কৃতিজগৎ একজন সংযোগকারী মানুষকে। আর আমরা হারালাম স্মৃতির পরিচিত একটি কণ্ঠ। সম্পত্তি দলিলে লেখা যায়, বইয়ের সংখ্যা গোনা যায়, পুরস্কারের সাল নথিতে থাকে; কিন্তু কার হাসিতে ঘর ভরে উঠেছিল, কে কার রান্নার প্রশংসা করে আরেকবার ডাকতে বলেছিল-এই উত্তরাধিকার কোনো খতিয়ানে ওঠে না। অথচ শেষ পর্যন্ত মানুষ বেঁচে থাকে সেখানেই।
শেষ কথা
এই চারটি গল্প আমাদের চার ধরনের উত্তরাধিকার দেখায়। মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি দেন, কিন্তু আইনকে নিশ্চিত করতে হয় যেন তাঁরা নিজের ঘর ও মর্যাদা না হারান। একটি দেশ পর্যটক ও প্রযুক্তিকে স্বাগত জানায়, কিন্তু নজরদারির ফাঁকে যেন প্রতারণার বাসা না বাঁধে। নির্বাচন কমিশন প্রযুক্তি নেয়, কিন্তু ভোটাধিকার কোনো অদৃশ্য গণনাপদ্ধতির দয়ায় ছাড়তে পারে না। আর একজন লেখক চলে যান, রেখে যান বইয়ের চেয়েও বড় কিছু-ভাষা, হাসি, সম্পর্ক ও অসমাপ্ত আড্ডা।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। সত্য; তবে অন্ধ বিশ্বাসকে শাসনব্যবস্থা বানানোও ভুল। বিশ্বাস রক্ষায় চাই স্পষ্ট আইন, সক্রিয় প্রতিষ্ঠান, যাচাইযোগ্য প্রযুক্তি ও সম্পর্কের যত্ন। দলিলে ভোগাধিকার লেখা যায়, মমতা নয়। গণনাপদ্ধতি ভোটার চিনতে পারে, নাগরিকের মর্যাদা বোঝে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমীরুল ভাইয়ের ভাষা অনুকরণ করতে পারে, আমাদের না-হওয়া আড্ডার আফসোস অনুভব করতে পারে না।
প্রযুক্তি আমাদের গতি দ্রুত করবে, আইন সুরক্ষা দেবে, প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলায় রাখবে; কিন্তু কোনো দেখা আর ‘পরে’ ফেলে রাখা যাবে না-সে সিদ্ধান্ত মানুষকেই নিতে হবে। যন্ত্র যত বুদ্ধিমান হোক, সভ্যতার শেষ স্বাক্ষরটি এখনো মানুষেরই।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ; উপস্থাপক, তৃতীয় মাত্রা, চ্যানেল আই