EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

ভূমধ্যসাগরে ডুবছে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ও মর্যাদা

ইউরোপের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য ভয়ংকর রুট হয়ে উঠেছে লিবিয়া

মোঃ শাহাদাৎ হোসেইন

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৮ এএম

ভূমধ্যসাগরে ডুবছে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ও মর্যাদা
অ অ

ইউরোপের চাকচিক্যময় জীবন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানি দীর্ঘদিন ধরে হাজারো বাংলাদেশি তরুণের কাছে সোনালি স্বপ্ন হয়ে আছে। কিন্তু সেই স্বপ্নই ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্র ও স্থানীয় দালালদের প্রলোভনে পড়ে প্রতিবছর শত শত বাংলাদেশি তরুণ ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পানিতে প্রাণ হারাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের মর্যাদাও। পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, আর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণের ভবিষ্যৎ।

উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া অনিয়মিত অভিবাসনের এই ভয়ংকর যাত্রার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে উঠে এসেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা এখন অন্যতম বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্স এবং ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বড় অংশ।

ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা তাই অনেক বাংলাদেশি তরুণের জন্য পরিণত হয়েছে করুণ ও প্রাণঘাতী পরীক্ষায়। এর পাশাপাশি, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের কারাগার বা আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিপুলসংখ্যক নথিবিহীন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনেকেই শূন্য হাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেছেন।

গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) লিবিয়ার বিভিন্ন আটককেন্দ্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকা ১৭৪ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তারা দেশে ফেরেন।

লিবিয়া হয়ে শুরু হয় ভয়ংকর যাত্রা

লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাচার হওয়া বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ প্রথমে ঢাকা থেকে ভ্রমণ বা পর্যটন ভিসায় যাত্রা শুরু করেন। এরপর মিসর, দুবাই কিংবা তুরস্কের মতো ট্রানজিট দেশ হয়ে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়ায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই উত্তর আফ্রিকার দেশটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্রের অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অভিবাসীদের শুরু হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। পাচারকারীদের ক্যাম্পে তাদের জিম্মি করে রাখা হয় এবং চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।

ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানো বাংলাদেশি তরুণদের ৭৫ শতাংশই কাজের সন্ধান পান না। তাদের ৯৩ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে আটক বা বন্দিদশার শিকার হন এবং ৭৯ শতাংশ সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন। জিম্মি করে রাখা ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে পাচারকারীরা ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্যাতনের পর এসব অভিবাসীকে প্লাস্টিকের পণ্য ও কাঠ বহনকারী নৌযানেও গাদাগাদি করে তুলে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা।


ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানির করুণ চিত্র

২০২৬ সালের মার্চে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। লিবিয়ার তোব্রুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় একটি নৌকা পথ হারিয়ে ফেললে অন্তত ১৮ বাংলাদেশি মারা যান। খাবার ও পানির অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়।

ফ্রন্টেক্স ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সম্মিলিত তথ্য অনিয়মিত অভিবাসনের কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় রুটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া-ভূমধ্যসাগরীয় রুট ব্যবহার করে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন বলে জানা গেছে।

ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত গত এক দশকে ভূমধ্যসাগরসহ অন্যান্য সমুদ্রপথে বিপজ্জনকভাবে অভিবাসনের চেষ্টা করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। কারণ সাগরে ডুবে যাওয়া কিংবা দুর্গম মরুভূমিতে মারা যাওয়া অনেকের কোনো তথ্য বা সরকারি নথি পাওয়া যায় না।

কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন তরুণরা?

উচ্চ আয় এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় অনিয়মিত অভিবাসীরা মূলত এসব বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নেন। পাচারকারী ও দালালরা ইউরোপে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া এবং চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আকৃষ্ট করে।

যারা বৈধ ভিসা সংগ্রহ করতে পারেন না কিংবা নিয়মিত অভিবাসনের ব্যয় বহন করার সামর্থ্য রাখেন না, তাদের কাছে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথটি বিকল্প হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু এই পথে রয়েছে ডুবে মৃত্যু, আটক, নির্যাতন ও শোষণের ভয়াবহ ঝুঁকি।

বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, পারিবারিক চাপ, ঋণের বোঝা, দেশে সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দালালদের ছড়ানো মিথ্যা তথ্য—এসবই বিপজ্জনক যাত্রার অন্যতম কারণ।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকেই মানব পাচারচক্রের হাতে বন্দি হয়ে পড়েন। তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এরপর অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ও চলাচলের অনুপযোগী নৌকায় তুলে ইউরোপের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

দেশের ভাবমূর্তিতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব

অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাজারো বাংলাদেশি বিপজ্জনক ও অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করায় অনেক দেশ বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা যাচাই আরও কঠোর করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ভিসামুক্ত ও বিমানবন্দরে ভিসা পাওয়ার সুযোগের দিক থেকেও বাংলাদেশ উগান্ডাসহ বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এতে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

বন্ধ করতে হবে মানব পাচারের চক্র

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে একাধিক ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে অবৈধ দালালচক্র ও মানব পাচার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে।

একই সঙ্গে দেশে তরুণদের হতাশার মূল কারণগুলো দূর করতে কার্যকর অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, অভিবাসন এজেন্সিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি এবং বিদেশে নিরাপদ ও বৈধ শ্রম অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।

মানব পাচারকারীদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির জায়গায় দেশে যদি বাস্তব কর্মসংস্থান ও উন্নত ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করা না যায়, তাহলে ভূমধ্যসাগর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও মর্যাদার কবর হয়েই থেকে যাবে।

লেখক: সিনিয়র সাব-এডিটর ডেইলি সান

আরও পড়ুন