এআই দক্ষতায় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
এ এইচ এম ফারুক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম
একুশ শতকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটছে, তার মূল কেন্দ্রে রয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুষঙ্গ— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। প্রথাগত ডাটা প্রসেসিং, উৎপাদনশীল খাত থেকে শুরু করে চিকিৎসা, শিক্ষা, অর্থায়ন ও মহাকাশ গবেষণা— বিশ্ব প্রযুক্তির প্রতিটি শাখায় এআই আজ নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছে। আমেরিকা, চীন, ভারত থেকে শুরু করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান দেশগুলো আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান মজবুত করছে। এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মতো একটি বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এআই কেবল প্রযুক্তিগত পছন্দ নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অপরিহার্য চাবিকাঠি।
সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের নানা পরিকল্পনা ও সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে। আইসিটি মন্ত্রী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির কেন্দ্রে রেখে তরুণদের দক্ষ করার প্রতিশ্রুতি দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের সাধারণ নাগরিক, প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণসমাজ ও গবেষকদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়। তবে এই আশাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে আমাদের বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিত, কৌশলগত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অতীতে যেসব সাধারণ ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ ওয়েব ডিজাইন কিংবা বেসিক গ্রাফিকসের কাজ করে আমাদের দেশের তরুণরা আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অটোমেশনের ফলে সেসব সাধারণ কাজের ক্ষেত্র বিশ্বজুড়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্ববাজার এখন প্রযুক্তি খাতে যে পরিবর্তন দাবি করছে, তা হলো— উচ্চতর দক্ষতার জনবল।
যারা এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, মেশিন লার্নিং, ডাটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ, বিশ্ববাজারে আজ তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী। যদি আমরা সময়মতো আমাদের তরুণদের এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে না পারি, তবে অতীতের অর্জিত আউটসোর্সিং বাজার আমরা হারাতে বসেছি।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ যখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আত্মনির্ভরশীল ও এক নতুন অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই আইসিটি খাতকে প্রথাগত শ্রম ও একক-পণ্যনির্ভর অর্থনীতির প্রধান বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে আমাদের তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) দক্ষ এক বিশাল মানবসম্পদ হাব গড়ে তোলা যায়, তবে এটিই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক রূপকল্প ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনাই পারে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় কৌশলগত মিশন’-এ রূপান্তরিত করতে।
একই সাথে আইসিটি মন্ত্রীর কাছে বিনীত পরামর্শ থাকবে— এআই-কেন্দ্রিক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে হলে কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা বা সাময়িক ট্রেনিং প্রোগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী ‘জাতীয় এআই রোডম্যাপ’। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন আবশ্যক। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর কম্পিউটার সায়েন্স কারিকুলামকে অবিলম্বে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী রি-ডিজাইন করতে হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার পরিবর্তে প্র্যাকটিক্যাল, অ্যালগরিদম ডিজাইন, ডাটা অ্যানালিটিক্স ও মেশিন লার্নিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে আইসিটি বিভাগ ও প্রথম সারির সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সমন্বয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ মজবুত করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা কোর্স শেষ করার পরপরই সরাসরি বাজারে যুক্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক বাজারে এআই ট্রেনিং ও মডেল ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল কম্পিউটিং পাওয়ার ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) অবকাঠামো, যা ব্যক্তিগতভাবে কেনা কোনো তরুণ বা গবেষকের পক্ষে অসম্ভব। সরকারের উদ্যোগে হাই-টেক পার্ক ও দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় পর্যায়ের ‘এআই এক্সিলেন্স সেন্টার’ ও ‘সুপারকম্পিউটিং ও ক্লাউড ল্যাব’ স্থাপন করতে হবে। যেখানে দেশের মেধাবী ডেভেলপার ও স্টার্টআপগুলো বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে বড় বড় এআই মডেল তৈরির প্রসেসিং পাওয়ার পাবে।
তৃতীয়ত, বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন— মাইক্রোসফট, গুগল, এনভিডিয়া, মেটা)—এর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক স্তরের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্টিফাইড ট্রেনিং প্রোগ্রাম দেশেই সরকারি স্পন্সরশিপে পরিচালনা করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে আমাদের ফ্রিল্যান্সাররা বিশ্বমানের আইটি সার্টিফিকেশন অর্জন করবে এবং বিশ্বজুড়ে রিমোট জবের বাজারে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবে।
চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির আধুনিকায়নে এআই- এর স্থানীয় ব্যবহার বাড়াতে হবে। দেশের তৈরি পোশাক খাত, কৃষি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যে রোগ নির্ণয় এবং ব্যাংকিং খাতের জটিল ঝুঁকি মূল্যায়নে যদি স্থানীয় এআই স্টার্টআপগুলোর উদ্ভাবন ব্যবহার করা যায়, তবে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রাথমিক বাজার পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
পরিশেষে বলা যায়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো বিলাসী উদ্ভাবন নয়, বরং দেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আধুনিক অর্থনৈতিক রূপকল্প এবং মাননীয় আইসিটি মন্ত্রীর আন্তরিক ও কঠোর তদারকি যদি একত্রে কাজ করে, তবে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ এআই-দক্ষ মানবসম্পদের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক হাবে পরিণত হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বমঞ্চে অনুকরণকারী নয়, বরং উদ্ভাবক ও দক্ষ জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ইমেইল: [email protected]