বাজেটে শিক্ষায় তৃতীয় ভাষা: বৈশ্বিক নেতৃত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত
এ. কে. এম. মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
প্রস্তাবিত ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের বহু ইতিবাচক ও দূরদর্শী উদ্যোগের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ এবং আমরা আন্তরিকভাবে সরকারকে স্বাগত জানাই। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সাহসী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী। দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ইতিহাসে ১১ জুন ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন।
বাজেট অধিবেশনে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রস্তাব দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করা যেতে পারে। তথ্য ও প্রযুক্তির বিশ্বায়নের যুগে জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগাযোগের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভাষাগত সক্ষমতা যে অপরিহার্য, এ উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে গৃহীত প্রযুক্তি-কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও সফলতা আসবে।
একবিংশ শতাব্দীতে ভাষা আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের অন্যতম ভিত্তি। যে জাতি যত বেশি ভাষায় দক্ষ, সে জাতির আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের সুযোগও তত বেশি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ কথারই প্রমাণ দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশে শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং আরও অন্তত একটি বিদেশি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করে। ফলে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অধিক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনও স্বল্প বা মধ্যম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করেন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষতার অভাবে তারা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
অন্যদিকে বিশ্বের বহু উন্নত দেশ বর্তমানে দক্ষ জনবল সংকটে ভুগছে। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, স্পেনসহ ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দেশের শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিদেশি দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যদি মাধ্যমিক, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি পর্যায় থেকেই জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান, ফরাসি, রুশ, স্প্যানিশ, আরবি বা চীনা ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে আগামী এক দশকের মধ্যেই একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠবে যারা আগামীতে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার প্রতিযোগিতামূলক হলেও তারা অনেক ভালো করবে। তারা শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানই নয়, বরং উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিশ্বের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ভাষাগত যোগ্যতা থাকলে বৃত্তি ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। জার্মানির বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান ভাষা জানলে পড়াশোনার সুযোগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ফলে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষার আরেকটি বড় সুবিধা রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, পেটেন্ট, প্রযুক্তিগত নথি এবং শিল্প-উদ্ভাবন বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়। ফলে বহুভাষিক দক্ষতা গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ। তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এ ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ ভাষা দক্ষতা সরাসরি কর্মসংস্থান, গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কে কাজ করার জন্য বহুভাষিক দক্ষতা বিশেষ মূল্য বহন করে। ভাষাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, দক্ষ ভাষা শিক্ষক তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ভাষা শিক্ষাকে শুধুমাত্র পরীক্ষাভিত্তিক না করে ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্থত, দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সঙ্গত কারণেই তৃতীয় ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চাকরির বাজারসহ জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা, কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি, সেসব দেশের ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প ভাষা নির্বাচনের সুযোগ রাখা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অনুযায়ী ভাষা নির্বাচন করতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, ডিজিটালাইজেশন, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের মতো উদ্যোগগুলোর সুফল আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের বিশ্বে প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনীতির নয়; এটি জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে হলে তাদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয় ভাষা শিক্ষা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
বাস্তবতার ভিত্তিতে সঠিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন কৌশলের মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষায় তৃতীয় ভাষা অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপে পরিণত হতে পারে। এটি কেবল একটি শিক্ষানীতি নয়; বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বৈশ্বিক অংশগ্রহণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত রূপরেখা। আজকের এই বিনিয়োগই আগামী দিনের দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, বহুভাষিক, কর্মসংস্থান সৃস্টি এবং বিশ্বমানের বাংলাদেশি প্রজন্ম তৈরির ভিত্তি স্থাপন করবে, যারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে এবং একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণে নেতৃত্ব দেবে।
লেখক: কলামিস্ট, সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা); উপ-পরিচালক ও প্রধান, ফ্যাকাল্টি এইচআর অফিস, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি