প্রধানমন্ত্রীর বিকৃত ছবি শেয়ার দেওয়ায় গ্রেপ্তার: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাকি ডিজিটাল অপরাধ?
যায়েদ হোসেন মিশু
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
অজ্ঞাত এক নারীর আপত্তিকর ছবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি বসিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে অপপ্রচারের অভিযোগে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামে এক জামায়াত কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে কারও মানহানি করা কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নাকি অপরাধ? ডিজিটাল নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের সীমারেখা—এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সূত্রে জানা যায়, ‘‘অজ্ঞাত এক নারীর আপত্তিকর ছবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি এডিট করে ‘অনেক দিন পর বান্ধবীর সঙ্গে দেখা’ ক্যাপশন দিয়ে একটি পেইজ থেকে পোস্ট করা হয়। সেই পোস্টটি আবার নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ারও করেন জামায়াত কর্মী আজিজুল হক। ছবিটি স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের নজরে এলে তারা প্রতিবাদ জানান। এতে সেখানে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নানা সমালোচনার মুখে বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে উপজেলার ঝনকা বাজার এলাকা থেকে আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।’’
স্থানীয়রা জানান, অভিযুক্ত আজিজুল হক মুক্তাগাছা উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ঝনকা বড়টেঙ্গর গ্রামের ইব্রাহিমের ছেলে। তিনি স্থানীয় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ওই ফেসবুক পেইজটি তিনিই পরিচালনা করতেন। সেখান থেকে নিয়মিত দেশবিরোধী ও বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেওয়া হতো এবং গুজব ছড়ানো হতো।
প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং বিশেষ করে নারীদের ছবি ‘এআই’-এর মাধ্যমে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানহানি ঘটছে এবং সমাজে তাকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেকেই আবার এসব ছবি ও ভিডিও বিশ্বাসও করছেন। কিন্তু এর শেষ কোথায়? সমাধান কী?
মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান জানান, ‘অজ্ঞাত এক নারীর অশ্লীল ছবির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি যুক্ত করে একটি পোস্ট করা হয়। পরে সেই পোস্টটি নিজের ফেসবুক আইডি থেকে শেয়ার করেন আজিজুল হক। এছাড়াও তার পরিচালিত একটি নার্সারিতে গভীর রাতে অচেনা লোকজন নিয়ে বৈঠক করতেন—এমন সন্দেহও ছিল। অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন। এর প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে ঝনকা বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী মো. ফজলু। বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার হলেও তা সীমাহীন নয়। রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো, মানহানি করা কিংবা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করার মতো কর্মকাণ্ড এই স্বাধীনতার আওতায় পড়ে না। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ফারহানা জামান বলেন, ‘এ ধরনের কনটেন্ট পুরো সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে। মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সামাজিক চলাফেরায় প্রভাব পড়ে এবং সম্পর্ক নষ্ট হয়। অনেক সময় কাছের মানুষরাও ভুল করে এমন কনটেন্ট বিশ্বাস করতে পারে। আমাদের আইন আছে, আইনে কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে, কিন্তু যথাযথ বাস্তবায়ন প্রায় নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে এডিট করা ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন, কিন্তু সঠিক সমাধান পাননি। ফলে তিনি ধীরে ধীরে মিডিয়া থেকে সরে গেছেন বা সামনে কম আসছেন। ছাত্রনেতারাও এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন। আমরা মনে করি, আইন সম্পর্কে জনগণ সচেতন হলে অনলাইনে আপত্তিকর বা অশ্লীল কনটেন্ট ছড়ানো কমানো সম্ভব।’
আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, বা এর কোনো সীমা আছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ফারহানা জামান আরও বলেন, ‘একজনের স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘর্ষ করলে সীমার প্রশ্ন আসে। যা আপনার কাছে স্বাধীনতা, তা অন্যের কাছে নাও হতে পারে। আপনার স্বাধীনতার কারণে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা একটি জাতীয় ডিজিটাল এথিক্যাল গাইডলাইন প্রণয়নের প্রস্তাব করছি। এটি আইন নয়, কিন্তু স্পষ্টভাবে বলে দেবে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না। ছোটবেলা থেকেই এই গাইডলাইনের চর্চা থাকলে, কাল্টিভেশন থিওরি অনুযায়ী মানুষ বড় হয়ে নৈতিক সীমা অতিক্রম করবে না। এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে সরকার, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষসহ সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা কার্যকর করতে এথিক্যাল প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।’
সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, ‘বর্তমানে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, হেয় প্রতিপন্ন করা, নিজের খেয়ালখুশিমতো অন্যের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করা কিংবা অপপ্রচার চালানো এক ধরনের অসুস্থ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আপনি অন্যকে অহেতুক আক্রমণ করবেন। বিভিন্ন প্রসঙ্গে দেখা যায়, দেশ-সমাজ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এমন মন্তব্য করা হয়, যা অন্যকে আঘাত করে এবং তার সামাজিক বা পেশাগত জীবনকে জটিল করে তোলে। ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের আচরণের প্রবণতা বাড়ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে, আবার সচেতনতার অভাবও থাকতে পারে। আমাদের সামাজিক আচরণেও সমস্যা রয়েছে—আমরা ভিন্ন মত সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না।’
এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ দমনে উন্নতির অনেক সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। অন্য দেশ কী করছে তা নয়, বাংলাদেশে আমরা কী করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তির একাধিক আইডি সীমিত করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারকে নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। ব্যবহারকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা গেলে অপব্যবহার কমবে। পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এই দুটি বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অপরাধ কমবে এবং মানুষ আরও সচেতন হবে যে ভুল করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’