দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা
একেএম মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১১:৪০ এএম
আমাদের বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রচলিত গুনে ধরা সংস্কৃতির রূপান্তরের সময় অতিক্রম করছে। তিন দশক আগে থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর অবস্থা থেকে ক্রমশ শিল্প ও সেবাভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করেছে। পরিবর্তনের এই সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিপুল তরুণ জনশক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২৫-২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু একটি বাস্তবতা স্পষ্ট—এই রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখনও আসে কম দক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে। তাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যক্রম ও কারিকুলামকে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গবেষণামুখী করে পুনর্গঠন করার এখনই সময়। তবে এর সূচনা করতে হবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই। প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী ও খেলনাও তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১১০টিরও বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজারের বেশি কলেজ উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষা বৈশ্বিক শিল্প ও প্রযুক্তির চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; পাশাপাশি কার্যকর নজরদারিরও ঘাটতি রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সিলেবাস, কারিকুলাম ডিজাইন, ল্যাবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রস্তুত ও চালু করা অত্যন্ত জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স, বায়োটেকনোলজি, উন্নত প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং পরিবেশ প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
শুধু কারিকুলাম প্রণয়ন বা পাশ করলে-করালেই হবে না; কার্যকর তদারকি ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট পেশাগত কাউন্সিলগুলোর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে কারিকুলাম মূল্যায়ন, প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, ল্যাব সুবিধা যাচাই, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা দরকার। অনেক উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয় কারিকুলাম প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনা করা হয় এবং শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী তা সংশোধন করা হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের জাতীয় পর্যায়ের কারিকুলাম রিভিউ ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বাস্তব দক্ষতা অর্জনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য Public–Private Partnership (PPP) একটি অত্যন্ত কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাত একসঙ্গে কাজ করলে আধুনিক গবেষণাগার, প্রযুক্তি পার্ক, ইনোভেশন সেন্টার এবং শিল্পসংযুক্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গড়ে তোলা সম্ভব। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক আয় হচ্ছে। এই শিল্পখাতগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কার্যক্রমকে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা গেলে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির গতি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ হলেও প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। দক্ষ নারী প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এবং ফিলিপাইন স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে; বাংলাদেশও একই ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই রূপান্তরের নেতৃত্ব ও মনিটরিং রাষ্ট্রকেই করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রশাসনকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোচিং-প্রাইভেট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যদি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন সরকার, তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সংস্কার, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গবেষণামুখী শিক্ষায় পুনর্গঠিত হবে।
সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী দশকে বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়বে, রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং একটি উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে। বাংলাদেশ বিশ্বে নতুন করে পরিচিতি পাবে।
লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (DUJA)