ঈদের আগেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা প্রয়োজন
যারা অন্য দেশের মানুষের জন্য উৎসবের পোশাক তৈরি করেন, তারাই অনেক সময় নিজেদের ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৬ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় তৈরি পোশাক খাতকে। এই খাতের লাখো শ্রমিক-যাদের বেশিরভাগই নারী। প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে যে পোশাক তৈরি করেন, তা রপ্তানি হয়ে পৌঁছে যায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় মার্কেটে। কিন্তু এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের চোখে পড়ে প্রতি বছর ঈদের আগে। যারা অন্য দেশের মানুষের জন্য উৎসবের পোশাক তৈরি করেন, তারাই অনেক সময় নিজেদের ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। কখনো কখনো ঈদ বোনাসের দাবিতে জীবন কিংবা রক্ত দিতে হয় শ্রমিকদের। এটা কি শুধু একটি প্রশাসনিক ইস্যু, নাকি এটি মানবিক ও নৈতিকতার বড় প্রশ্ন?
ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই সময় পরিবারের সবাই নতুন পোশাক পরে, ঘরে ভালো খাবার রান্না হয়, শহরে বা গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বড় অংশই শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন, কিন্তু তাদের পরিবার থাকে গ্রামে। ঈদের আগে বেতন ও বোনাস না পেলে তারা গ্রামে যেতে পারেন না, সন্তানদের নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেন না, বাবা-মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে পারেন না। ফলে উৎসব আনন্দের বদলে হয়ে ওঠে মানসিক চাপের সময়।
একজন শ্রমিক মাসের পর মাস কাজ করে যে বেতন পান, তা তার ন্যায্য অধিকার। ঈদের আগে সেই বেতন ও বোনাস সময়মতো দেওয়া শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব। একজন মা যদি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে বাধ্য হন- ‘এইবার নতুন জামা হবে না’- তাহলে সেটি শুধু অর্থের সংকট নয়, এটি মর্যাদার আঘাত। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন সে তার শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদাকে সম্মান দেয়।
ঈদের আগে শ্রমিকদের হাতে টাকা এলে সেই টাকা বাজারে খরচ হয়। স্থানীয় দোকানদার, হাট-বাজার, পরিবহন খাত- সবখানে টাকার সঞ্চালন বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’। একটি কারখানা যদি সময়মতো বেতন-বোনাস দেয়, তাহলে শুধু শ্রমিকই উপকৃত হন না; উপকৃত হয় পুরো স্থানীয় অর্থনীতি। তাই সময়মতো পরিশোধকে খরচ নয়, বরং একটি ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে দেখা উচিত।
প্রায়ই দেখা যায়, ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ে। কারখানার সামনে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি- এসব দৃশ্য আমরা নতুন করে দেখছি না। অথচ সময়মতো বেতন দিলে এই অস্থিরতা অনেকটাই এড়ানো যায়। একটি শিল্প টেকসই হতে হলে সেখানে আস্থা থাকতে হয়। শ্রমিক যদি মনে করেন মালিক তার প্রাপ্য সময়মতো দেবেন, তাহলে উৎপাদনশীলতাও বাড়ে, কর্মপরিবেশও স্থিতিশীল থাকে।
বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম দেখেন না; তারা শ্রমিক অধিকার, কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি- এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেন। অতীতে রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এরপর নানা সংস্কার হয়েছে। এখন যদি নিয়মিত বেতন-বোনাস ইস্যুতে নেতিবাচক খবর ছড়ায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা কমতে পারে। তাই সময়মতো পরিশোধ শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বৈদেশিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িত।
দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ বাধ্যতামূলক। বোনাসের ক্ষেত্রেও প্রচলিত নীতিমালা রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এই আইন কার্যকর করা। শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না; প্রয়োজনে মনিটরিং বাড়াতে হবে, অনিয়ম করলে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের বাস্তব সমস্যাও বিবেচনায় নিতে হবে- ব্যাংক ঋণ জটিলতা, রপ্তানি বিলম্ব, ডলার সংকট- এসব থাকলে সরকার সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকের প্রাপ্য আটকে রেখে সমাধান খোঁজা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।
আমাদের সমাজে বৈষম্য একটি বড় বাস্তবতা। একদিকে শহরের বড় শপিংমলে লাখ টাকার কেনাকাটা, অন্যদিকে একজন শ্রমিকের ১৫-২০ হাজার টাকার বেতন নিয়েও অনিশ্চয়তা- এই বৈপরীত্য অস্বস্তিকর। ঈদ এমন একটি সময়, যখন সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেওয়া হয়। যদি সেই সময়েই শ্রমজীবী মানুষের মুখে হাসি না থাকে, তাহলে উৎসবের তাৎপর্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
গার্মেন্টস খাতে অধিকাংশ শ্রমিক নারী। তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে অনেক পরিবার। সময়মতো বেতন না পেলে নারীরা পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বল হয়ে পড়েন, ঋণের ফাঁদে পড়েন, এমনকি উচ্চ সুদে ধার নিতে বাধ্য হন। ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা মানে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্মান করা।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সরাসরি মানসিক চাপে রূপ নেয়। শহরে থাকা শ্রমিকরা বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, যাতায়াত- সবকিছু সামলে চলেন। ঈদের আগে যদি বেতন আটকে যায়, তাহলে উদ্বেগ, হতাশা, এমনকি পারিবারিক দ্বন্দ্বও বাড়তে পারে। কর্মস্থলে এর প্রভাব পড়ে উৎপাদনশীলতায়। তাই সময়মতো পরিশোধ একটি মানসিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও বটে।
তবে একটি বাস্তব প্রশ্ন আছে- সব কারখানা কি একইভাবে সক্ষম? ছোট ও সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলো অনেক সময় বড় অর্ডারদাতার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড যদি বিলম্বে পেমেন্ট দেয়, তার প্রভাব পড়ে স্থানীয় মালিকের ওপর। তাই সমাধান হতে হবে সমন্বিত। বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়মতো বিল পরিশোধে বাধ্য করতে হবে। ব্যাংকিং সাপোর্ট সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে ঈদের আগে বিশেষ প্রণোদনা স্কিম চালু করা যেতে পারে, যাতে শ্রমিকের বেতন অগ্রাধিকার পায়।
এখানে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ককে সংঘাতের চোখে না দেখে পার্টনারশিপের চোখে দেখা জরুরি। শ্রমিক শুধু ‘ম্যানপাওয়ার’ নন; তিনি উৎপাদনের কেন্দ্রীয় শক্তি। মালিক যদি শ্রমিকের কল্যাণে আন্তরিক হন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তিনিও লাভবান হন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু কম দামের নয়; এটি ‘এথিক্যাল প্রোডাকশন’ বা নৈতিক উৎপাদনের কম্পিটিশন। যে দেশ শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস খাত শুধু রপ্তানি আয় আনে না; এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও চালিকাশক্তি। গ্রাম থেকে শহরে এসে নারীরা কাজ করছেন, পরিবার চালাচ্ছেন, সন্তানদের পড়াচ্ছেন। এই অগ্রযাত্রাকে সম্মান জানাতে হলে তাদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো দিতে হবে। ঈদের আগে বেতন-বোনাস দেওয়া কোনো দয়া নয়; এটি অধিকার।
সবশেষে বলা যায়, বিষয়টি কেবল অর্থের হিসাব নয়; এটি মূল্যবোধের প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র, একটি শিল্পখাত, একটি সমাজ- কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় সে তার দুর্বলতম মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তা থেকে। ঈদের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা মানে তাদের মুখে হাসি ফোটানো, সন্তানদের স্বপ্ন পূরণ করা, গ্রামে অপেক্ষমাণ বাবা-মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু আনা।
যদি আমরা সত্যিই উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও গ্লোবাল ব্র্যান্ড ইমেজ নিয়ে গর্ব করতে চাই, তাহলে প্রথম শর্ত হওয়া উচিত- শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। ঈদের আগেই বেতন-বোনাস দেওয়া হোক নিয়ম, ব্যতিক্রম নয়। তবেই উৎসব হবে সবার, আনন্দ হবে সমান ভাগে ভাগ করা।
(লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)