রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন
অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক সক্ষমতার বাস্তব বিশ্লেষণ: বিএনপি নাকি জামায়াত?
এ কে এম মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
এ কে এম মাহফুজুর রহমান।
বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং গণতান্ত্রিক পরিপক্বতারও একটি বড় পরীক্ষা।
দীর্ঘদিন ধরে যে দ্বিদলীয় শাসন কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিদায় হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক কাঠামো এবং নতুন একটি গণতান্ত্রিক ও সুশাসন ব্যবস্থা গঠনের দাবি আজ প্রতিষ্ঠিত। এই প্রেক্ষাপটে জনপরিসরে একটি প্রশ্ন বারবার সবার কাছে ঘুরে ফিরে আসছে: এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনগণের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রকৃত অভিজ্ঞ ও যোগ্যতায় কোন দল যোগ্য এবং প্রস্তুত?
১২ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার ৬০টি রাজনৈতিক দলে ভাগ হয়ে ভোট দানের মাধ্যমে ঠিক ওই সিদ্ধান্তটাই নিবে, তা হলো দেশ ও জনগণকে পরিচালনার যোগ্য—বিএনপি নাকি জামায়াতে ইসলামী?
বর্তমান রাজনৈতিক শূন্যতা, বিশেষ করে সার্বিকভাবে দেশের শাসন, অর্থনীতি সহ অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক পরিস্থিতি ও অস্থিরতা মোকাবেলায় কোন দলের উপস্থিতি বাস্তব অর্থে সক্ষম ও বেশি দৃশ্যমান প্রয়োজন তা গভীরভাবে ভেবে আমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোট দেওয়া খুবই জরুরি। এবং এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে নয়, বরং ইতিহাস, সংখ্যাগত বাস্তবতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতার আলোকে খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠন কোনো দলীয় জনপ্রিয়তার একক ফল নয়। এটি নির্ভর করে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, জোট রাজনীতির দক্ষতা, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। এই মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দল এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রস্তুতি বা বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন এবং ৩০.৮১ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করলেও জামায়াতে ইসলামী ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন অর্জন করেছিল। যা তৎসময়ে পতিত স্বৈরাচার এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ৩৫ আসনের প্রায় অর্ধেক। বিএনপির পরোক্ষ সমর্থনে সে সময় দলটি সংসদে প্রভাব ফেললেও সরকার গঠনের প্রধান কোনো শক্তি ছিল না।
১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসন এবং ৩৩.৬২ শতাংশ ভোট পেলেও ১৪৬টি আসন এবং ৩৭.৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। জামায়াতে ইসলামী তখন বিএনপির সঙ্গ ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৮.৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৩টি আসন অর্জন করেছিল। এমনকি জাতীয় পার্টি-এরশাদ ৩২টি আসন পেয়েছিল। এই নির্বাচন দেখিয়ে দেয়, ভোটের হার আর সরকার গঠনের সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন এবং ৪০.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে। জামায়াতে ইসলামী তখন পরোক্ষভাবে বিএনপির সমর্থন পেয়ে ১৭টি আসন এবং ভোটের হার আরও কমে ৪.২৮ শতাংশে নেমে আসে। বিএনপির সঙ্গে জোটের কারণে তারা সরকারে অংশীদার হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তিনটি নির্বাচনেই জামায়াতে ইসলামী কখনো এককভাবে সরকার গঠনের কাছাকাছিও যেতে পারেনি। এবং তাদের রাজনৈতিক প্রভাব সবসময়ই অন্য দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও মৌলিক বাস্তবতা বদলায়নি। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং দেশজুড়ে কার্যকর সাংগঠনিক উপস্থিতি। এই জায়গায় বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের কিংবা শরিকদের নেই।
সংখ্যার হিসাব আরও স্পষ্ট করে বিষয়টি তুলে ধরলে দেখা যাবে, ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ১৫১টি আসন। বাস্তবসম্মত ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট, অতীত বিশ্লেষণ, তরুণ প্রজন্ম এবং ভোটাভুটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণামতে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে হয়তো পূর্বের আসন সংখ্যার থেকে দ্বিগুন আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, তাও আবার অত্যন্ত অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ ও শক্তিশালী জোট সমঝোতা বিদ্যমান থাকার কারণে। কারণ, প্রাপ্ত ভোট ও ভোটার সংখ্যা আর আসন ভিত্তিক জয়লাভের জন্য মোট প্রাপ্ত ভোট এক জিনিস নয়। যাই হোক, ১২ তারিখের নির্বাচনের ফলাফলে হয়তো প্রকৃত চিত্র দেখা যাবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে জামায়াতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের অতীত ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। এই যুদ্ধ শুধু একটি ভৌগোলিক স্বাধীনতার লড়াই নয়; এটি ছিল গণতন্ত্র, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী যে ভূমিকা পালন করেছিল, তা আজও জাতির স্মৃতিতে গভীরভাবে প্রতীয়মান। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের বিচার ও দণ্ড—এই বিষয়গুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ইতিহাস নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কেউ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তুলতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস অস্বীকার করা বা এ বিষয়ে নীরব থাকা রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক যোগ্যতা প্রমাণ করে না।
একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়, তবে তাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের অবস্থান কী, তারা অতীতের ভুল থেকে কী শিক্ষা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংখ্যালঘু অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করবে। এই জায়গায় জামায়াতে ইসলামী এখনো কোনো সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থান উপস্থাপন করতে পারেনি বা জনগণ এখনো আস্থা রাখতে পারেনি বলে প্রতীয়মান।
এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ও শরিকদের রাজনৈতিক ভাষাও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। জনসভা ও বক্তব্যে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও অবজ্ঞাসূচক ভাষা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা রাষ্ট্র পরিচালনার পরিপক্বতার অভাবই প্রকাশ করে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও এটি সংবিধান অনুযায়ী একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র। এখানে সংখ্যালঘু, নারী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ধর্মভিত্তিক বিভাজনমূলক রাজনীতি এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সব সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা সত্ত্বেও অনেক ভোটারের কাছে একটি ‘পরিচিত শাসক’ হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম, বক্তব্য, আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনা ও এর উন্নয়নে গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জনগণকে জানিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের অতীত অভিজ্ঞতা থাকায় জনগণও আশ্বস্ত হয়েছে বলে প্রতীয়মান। কারণ, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনিশ্চিত সময়ে ভোটাররা প্রায়ই পরীক্ষিত রাজনৈতিক শক্তির দিকেই ঝুঁকে পড়ে। এটি রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
সবশেষে প্রশ্নটা তাই কে জিতবে বা সরকার গঠন করবে তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দেশব্যাপি অভিজ্ঞ, রাজনৈতিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপযুক্ত কোন দল? ইতিহাস, অতীত, অভিজ্ঞতা ও বর্তমান রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করলে উত্তরটি স্পষ্ট হয়, এবং আমরা ভোটার-জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি সেই সিদ্ধান্তটাই নিবো। কারণ, বাংলাদেশের আজ প্রয়োজন দায়িত্বশীল, সংযত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইসলামসহ সকল ধর্মের মৌলিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক দল কর্তৃক দেশ এবং জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। আসন্ন নির্বাচন তাই শুধু আসনের হিসাব নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং রাষ্ট্রচিন্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়।
লেখক: উপ-পরিচালক, ফ্যাকাল্টি এইচ আর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, এবং সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নালিস্টস এসোসিয়েশন (ডুজা)