EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

সংগ্রাম ও রূপান্তরের মহাকাব্য: খালেদা জিয়ার বিদায়

এটি গণতন্ত্র, স্বাধীনচেতা জাতীয়তাবাদ ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে গভীর শূন্যতা রেখে গেছে।

মো. আসিফ হাসান রাজু

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম

সংগ্রাম ও রূপান্তরের মহাকাব্য: খালেদা জিয়ার বিদায়
অ অ

ইতিহাসে কিছু নাম কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি যুগ, একটি চেতনা, একটি সংগ্রামের প্রতীক। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তেমনই এক নাম—যাঁর জীবন কেবল একজন নেত্রীর গল্প নয়, বরং এক গৃহবধূর রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরের অসাধারণ ইতিহাস। তাঁর প্রয়াণ তাই শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি গণতন্ত্র, স্বাধীনচেতা জাতীয়তাবাদ ও জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে গভীর শূন্যতা রেখে গেছে।

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া বেগম খালেদা জিয়া বেড়ে উঠেছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধ, শালীনতা ও পারিবারিক অনুশাসনের পরিবেশে। বিয়ের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন এক সাধারণ গৃহবধূ। সংসার, সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল তাঁর জীবন। রাজনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং নীরবতা ও সৌজন্যই ছিল তাঁর পরিচয়। কেউ কল্পনাও করেনি—এই নীরব, মার্জিত নারী একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেবেন।

১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গভীর শোক, অসীম বেদনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা তাঁকে শক্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত বিপর্যয়কে তিনি রূপান্তর করেন জাতীয় দায়িত্বে এবং কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রবেশ করেন রাজনীতির কঠিন অঙ্গনে। এই অগ্রযাত্রা কোনো ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার গল্প নয়; বরং এটি ছিল এক শোকাহত নারীর আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনের সংগ্রাম।

বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চ্যালেঞ্জ ও সংশয় অতিক্রম করে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর আপসহীন ভূমিকা তাঁকে গণতন্ত্রকামী মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থান, রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া এবং কারাবরণ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রতীক।

সবকিছু পেরিয়ে ১৯৯১ সালে তিনি ইতিহাস গড়েন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। বেগম খালেদা জিয়ার এই অর্জন কেবল ক্ষমতায় আরোহণ নয়; এটি ছিল একজন গৃহবধূর রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরের বিস্ময়কর ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প। ক্ষমতায় থাকাকালীন যেমন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, ক্ষমতার বাইরে থেকেও তেমনি ছিলেন প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর শাসনামল ছিল বৈচিত্র্যময়। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি ইসলামী মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস চালান। ধর্মীয় সহনশীলতা, মসজিদ–মাদ্রাসার উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সচেতন। তাঁর রাজনীতি ছিল ধর্মকে ব্যবহার করার নয়, বরং মূল্যবোধকে ধারণ করার।

এ ছাড়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর করা, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় তাঁর শাসনামলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি দৃঢ়তার পাশাপাশি সৌজন্য ও শিষ্টাচার বজায় রেখেছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশকে মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে স্বাতন্ত্র্যসূচক দিক ছিল বাংলাদেশপন্থা—অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখা। ‘বাংলাদেশ আগে’—এই বোধই ছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার মূলভিত্তি।

তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, যিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক ছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারাবন্দি করা হয়। গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তাঁকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়—যা মানবাধিকার ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন।

এই সময়েও তিনি প্রতিশোধের ভাষা বেছে নেননি; বরং নীরবতা, দোয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসাই ছিল তাঁর শক্তি। দীর্ঘদিন মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তাঁকে কারাবন্দি করে রাখা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং অসুস্থ শরীরে নিঃসঙ্গ কারাবাস—সবই ছিল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা। কিন্তু তিনি নতিস্বীকার করেননি। নীরব প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।

তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহমর্মিতা প্রমাণ করে, জনগণের হৃদয় থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন আমাদের শেখায়—নেতৃত্ব শুধু জন্মগত নয়, সংগ্রামের মাধ্যমেও অর্জিত হয়। তিনি ছিলেন উদার, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও ব্যক্তিগত সৌজন্য ও রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল।

শেষ দিনগুলোতে রাজনীতি থেকে দূরে থেকেও তিনি ছিলেন রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একটি জাতি তাঁকে নিয়ে ভেবেছে, তাঁর মুক্তি ও সুস্থতা কামনা করেছে।

তাঁর বিদায় তাই সাধারণ কোনো মৃত্যু নয়; এটি এক মহাকাব্যিক প্রস্থান। রাজপথের লড়াকু নারী, ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণকারী রাষ্ট্রনায়ক এবং নির্যাতনের মুখেও মাথা নত না করা এক খাঁটি বাংলাদেশপন্থি নেত্রীর যাত্রা সম্পূর্ণ হলো। ইতিহাস তাঁকে নিয়ে বিতর্ক করতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু একটি সত্য অমোঘ—বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য ও জটিল অধ্যায়।

একটি যুগের অবসান হলো। কিন্তু খালেদা জিয়ার নাম থেকে যাবে সংগ্রাম, সাহস, দৃঢ়তা ও বাংলাদেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখাবে—কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নীতিতে অটল থাকা যায়, কীভাবে জনগণের প্রতি আস্থা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে রাজনীতি করা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে তিনি চিরকাল একটি প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন।

লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

[email protected]

আরও পড়ুন