EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

খড়কুটোর আগুনে শীত নিবারণের চিরায়ত গল্প

‘লেপের চেয়েও ওম বেশি’

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩৫ পিএম

খড়কুটোর আগুনে শীত নিবারণের চিরায়ত গল্প

খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা। ছবি: সুজন মোহন্ত

অ অ

কনকনে উত্তুরে হাওয়া আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে যমুনা বিধৌত শাহজাদপুর। ভোরে সূর্যের দেখা মিলছে না অনেক বেলা অবধি।

হাড়কাঁপানো এই শীতে যখন জবুথবু জনজীবন, ঠিক তখনই শাহজাদপুরের গ্রামগুলোতে দেখা যায় এক চিরায়ত উৎসব। না, কোনো অনুষ্ঠান নয়- এ হলো খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের লড়াই।

শাহজাদপুরের পোরজনা ও কায়েমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে কুয়াশার রাজত্ব। হিমেল বাতাসে হাত-পা জমে যাওয়ার দশা। এমন সকালে গ্রামের মানুষ ঘর থেকে বেরিয়েই খোঁজে শুকনো খড় কিংবা গাছের ঝরা পাতা। বাড়ির আঙিনায় বা রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্বলে ওঠে আগুনের কুন্ডলী।

শাহজাদপুরের তাঁতপল্লীগুলোতে কাজ শুরু হওয়ার আগেই শ্রমিকরা জোট বাঁধেন এই আগুনের চারপাশে। আগুনের উত্তাপ নিতে নিতে চলে গতকালের কাজের হিসাব কিংবা আজকের বাজারদরের গল্প। বয়স্কদের পাশাপাশি ছোট শিশুদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। হাতে হাত ঘষে আগুনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীত তাড়ানোর এক অদ্ভুত তৃপ্তি কাজ করে সবার চোখেমুখে।

আগুন পোহানো অবস্থায় কথা হয় পোরজনা গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব রহমত আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাপু, আমাগো গেরামে এইডাই নিয়ম। রাত ফুরাইলে কুয়াশার মধ্যে লেপের তলে থাকা যায় না। বাইরে আইসা খড়ের আগুনের তাপ নিলে মনে হয় জান ফিরে পাইলাম। এই আগুনের ওম কোনো কম্বলে পাওয়া যায় না।’

শাহজাদপুর মূলত কৃষি ও তাঁতপ্রধান এলাকা। সকালে গবাদি পশুকে খাওয়ানো কিংবা জমিতে সেচ দিতে যাওয়ার আগে কৃষকরা দলবেঁধে এভাবে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করে নেন। যমুনার চরাঞ্চলগুলোতে শীতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় সেখানে আগুনের এই ওমই যেন নিম্নবিত্ত মানুষের একমাত্র ভরসা।

নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই খড়কুটোর আগুনই শীত জয়ের একমাত্র অস্ত্র। শীতবস্ত্রের অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের জন্য এই ‘আগুনের উনুন’ পরম আশীর্বাদ। সকাল গড়িয়ে রোদ উঁকি না দেওয়া পর্যন্ত এই আগুনের কুন্ডলীকে ঘিরেই আবর্তিত হয় তাদের জীবন।

তবে প্রতি বছরই আগুন পোহাতে গিয়ে অসতর্কতায় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে শাড়ি বা পরনের লুঙ্গিতে আগুন লেগে দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে স্থানীয় চিকিৎসকরা শীতের সকালে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের আগুনের খুব কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়া ধোঁয়া চোখে গেলে বা ফুসফুসে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিও থাকে।

শাহজাদপুরের মাঠ থেকে যখন ধোঁয়া ওঠা কুয়াশা আর আগুনের কুণ্ডলীর লাল আভা একাকার হয়, তখন মনে হয় যেন কোনো শিল্পী যত্নে এঁকেছেন এই গ্রামবাংলার ছবি। যান্ত্রিকতার ভিড়ে এই অকৃত্রিম উষ্ণতাই বাঁচিয়ে রাখে শেকড়কে।

আরও পড়ুন