ধূসর কংক্রিটের রাজত্বে এক টুকরো সবুজ বিপ্লব
ধূসর দালানকোঠা আর কালো ধোঁয়ার এই শহরে এক চিলতে সবুজ যেন মহার্ঘ্য বস্তু। চারদিকে যখন গাছ কাটার মহোৎসব, তখন কিছু মানুষ নিজেদের ছাদকে বদলে ফেলেছেন এক একটি মিনি বনাঞ্চলে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি কাটাতে এখন আর পার্কে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না, বরং ঘরের ওপরের ছাদটিই হয়ে উঠছে অক্সিজেনের কারখানা।
আগে ছাদবাগান মানে ছিল কেবল দু-একটি পাতাবাহার বা গোলাপ গাছ। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারণা আমূল বদলেছে। সাভারের বাসিন্দা গৃহিণী শায়লা শারমিন গত তিন বছর ধরে তার ১০০০ বর্গফুটের ছাদে চাষ করছেন লাউ, শিম, টমেটো থেকে শুরু করে ড্রাগন ফল ও মাল্টা।
তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘এখন বাজার থেকে খুব একটা সবজি কিনতে হয় না। নিজের হাতে বিষমুক্ত সবজি তুলে খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। আর এই সবুজগুলো দেখলে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়’।
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আর বায়ুদূষণ রোধে ছাদবাগান এখন আর কেবল শৌখিনতা নয়, বরং সময়ের দাবি। একটি পরিকল্পিত ছাদবাগান ওই ভবনের তাপমাত্রা প্রায় ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে।
ছাদবাগান শহুরে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। গাছপালার সংস্পর্শে থাকা মানুষের মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা কম থাকে। পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে এই ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো।
এখন ইউটিউব বা ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই বাগান করার কৌশল শিখছে। এমনকি ‘রেডি টু সেটআপ’ ছাদবাগানের প্যাকেজ দিচ্ছে অনেক স্টার্টআপ কোম্পানি। ড্রিপ ইরিগেশন (ফোঁটা ফোঁটা জল সেচ) পদ্ধতির মাধ্যমে পানির অপচয় কমিয়ে আধুনিক উপায়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে ব্যস্ত চাকুরিজীবীরাও অনায়াসে বাগান করতে পারছেন।
তবে সব ছাদ বাগান করার উপযোগী নয়। অনেক সময় ছাদের ড্যাম্প (ভেজা ভাব) হওয়া বা অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকি থাকে। তাই বাগান করার আগে ছাদের জলছাদ বা সঠিক ওয়াটারপ্রুফিং করে নেওয়া এবং হালকা মাটির মিশ্রণ ব্যবহার করা।
ইটের পর ইট গেঁথে আমরা যে নগর গড়েছি, সেখানে হয়তো বিশাল বন তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিটি বাড়ির ছাদ যদি একটু একটু করে সবুজ হয়ে ওঠে, তবে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরগুলো আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো সজীবতা। আপনার ছোট একটি টবই হতে পারে সেই আগামী দিনের সবুজ বিপ্লবের সূচনা।