‘উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’
প্রজাপতি নিছক সৌন্দর্য নয়, পরাগায়ন ও খাদ্যশৃঙ্খলে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে।
হাতে এক টুকরো জীবন্ত শিল্প! ছবি: রাকিব আহমেদ
‘উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’- কথাটি কেবল একটি ছন্দ নয়, এটি প্রকৃতির এক নিগূঢ় সত্য। রংবেরঙের ডানা মেলে যখন প্রজাপতি বাতাসে ভাসে, তখন তা কেবল চোখের জন্যই আরামদায়ক হয় না, বরং গোটা প্রকৃতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। এই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অত্যাশ্চর্য সুন্দর জীবটি আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অপরিহার্য বার্তাবাহক।
প্রজাপতিকে প্রকৃতির চলমান শিল্পের সঙ্গে তুলনা করা চলে। তাদের ডানার বিচিত্র নকশা আর উজ্জ্বল রং মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়। কিন্তু তাদের ভূমিকা শুধুমাত্র সৌন্দর্য ছড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়।
মৌমাছির মতোই প্রজাপতিরা পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক ফুল থেকে আরেক ফুলে বসার মাধ্যমে তারা উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সাহায্য করে, যা ফসল উৎপাদন এবং বনের সজীবতা বজায় রাখতে অত্যন্ত জরুরি।

প্রজাপতিকে পরিবেশের স্বাস্থ্যের সূচক বা ‘বায়ো-ইনডিকেটর’ বলা হয়। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রজাপতির সংখ্যা এবং প্রজাতির বৈচিত্র্য দেখে বোঝা যায় সেখানকার পরিবেশ কতটা দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর। কোনো এলাকায় প্রজাপতির সংখ্যা কমে গেলে তা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
একটি প্রজাপতির জীবনচক্র- ডিম, শুঁয়োপোকা, পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে রূপান্তর- অত্যন্ত শিক্ষণীয়। শুঁয়োপোকা থেকে সুন্দর প্রজাপতিতে তাদের এই সম্পূর্ণ পরিবর্তন আমাদের জীবনেও রূপান্তর, আশা এবং নতুন শুরুর বার্তা দেয়। শুঁয়োপোকাগুলো অনেক পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য খাদ্য হিসেবে কাজ করে, যা পরিবেশের খাদ্য শৃঙ্খলকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

প্রকৃতির প্রতি আমাদের মনোযোগ বাড়াতে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে প্রজাপতি একটি দারুণ মাধ্যম। যখন আমরা তাদের রক্ষা করি, তখন আসলে আমরা নিজেদের বাস্তুতন্ত্রকেই রক্ষা করি।
প্রকৃতিতে তাদের এই মহৎ ভূমিকা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) আয়োজন করেছে তাদের ১৫তম প্রজাপতি মেলা। ‘উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’- এই স্লোগানে শুক্রবার সকাল থেকে মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় করেন শিশু, কিশোর-কিশোরীসহ হাজারো দর্শনার্থী।
সাদা জালের তৈরি একটি উন্মুক্ত বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির নানা রঙের জীবন্ত প্রজাপতির ওড়াউড়ি উপভোগ করতে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা মানুষের কোলাহলে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

মিরপুর থেকে ঘুরতে আসা সাদিয়া (৮) বলেন, ‘আমি প্রজাপতি মেলা দেখতে এসে খুব খুশি। এত রংবেরঙের প্রজাপতি এক সাথে আগে কখনো দেখিনি। সাদা জালের ঘরের ভেতরে যখন প্রজাপতিগুলো আমার পাশে দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন আমি রূপকথার জগতে এসেছি।’
বাবা-মায়ের সাথে মেলা দেখতে আসা মাহিম (১০) বলেন ‘আমি প্রজাপতি চেনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। টিভিতে বা বইয়ে যা দেখেছি, এখানে তা সামনে থেকে দেখতে পেলাম। তাদের ডানাগুলো এত সুন্দর! আমি বড় হয়ে গাছ লাগাবো যাতে আমাদের বাড়িতেও অনেক প্রজাপতি আসে।’
শিশুদের জন্য মেলায় ছবি আঁকা, প্রজাপতি চেনা, রঙিন প্রজাপতি দেখা ও নানান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অভিভাবকরা জানান, শহরমুখী জীবনে শিশুদের প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ কমে গেছে, এই মেলা সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করে।
-6933de4ee5845.jpg)
মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপাচার্য ড. কামরুল আহসান বলেন, ‘প্রজাপতিসহ সব প্রাণীর প্রতি আমাদের মানবিক ও যথাযথ আচরণ করতে হবে। মানুষ হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে এবং এসব প্রাণী আমাদের ওপর নির্ভরশীল।’
তিনি প্রাণী সংরক্ষণে নৈতিক দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি কীটনাশকের বিকল্প টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবার ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিভাজনের কারণে সমাজে যে অবনতি হচ্ছে, সেটি দূর করতেও এগিয়ে আসার কথা বলেন উপাচার্য।
জাবি শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এই প্রকৃতি তাদের জন্য এক নীরব শিক্ষক। প্রজাপতির অবাধ বিচরণ ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃতির প্রতি আরও যত্নশীল হতে শেখায়। জাবি ক্যাম্পাসের এই প্রজাপতিপ্রেম মনে করিয়ে দেয়- ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকে রক্ষা করার মাধ্যমেই আমরা বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্র এবং আমাদের নিজেদের জীবনকে রক্ষা করতে পারি।

দীর্ঘদিন ধরে প্রজাপতি মেলা জাবির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আগামী প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এ আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান মেলার আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মনোয়ার হোসেন
প্রকৃতির প্রতি আমাদের মনোযোগ বাড়াতে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে প্রজাপতি একটি দারুণ মাধ্যম। যখন আমরা তাদের রক্ষা করি, তখন আসলে আমরা নিজেদের বাস্তুতন্ত্রকেই রক্ষা করি।