স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে সকালে করুন যে ৫ কাজ
ডেইলি সান রিপোর্ট, জীবনযাপন
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সকালের ব্যস্ততা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজ বা পড়াশোনার তাড়া, পরিবারের দায়িত্ব কিংবা দিনের অন্যান্য প্রস্তুতির চাপে নিজের জন্য একটু সময় বের করা অনেকের পক্ষেই কঠিন। অথচ সকালের কিছু সহজ অভ্যাস দিনভর মেজাজ, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
২০২৫ সালে নেসপ্রেসো ও প্রজেক্ট হেলদি মাইন্ডসের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সকালের সময়টুকু তাঁদের সারাদিনের মানসিক সুস্থতা ও মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে সকালের রুটিন সবার জন্য এক রকম হওয়া জরুরি নয়। নিজের জীবনযাপন ও প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই কিছু অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। রাতের ঘুমের সময় মস্তিষ্ক তার স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বর্জ্য পদার্থ অপসারণেও কাজ করে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন, তা দিনের কাজের প্রস্তুতি ও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ভালো রাখতে প্রতিদিন সকালে যে পাঁচটি অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, সেগুলো জেনে নিন।
১. ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দিন শুরু করুন
ঘুম থেকে উঠেই কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে অনেকের সকালটাই অস্থির হয়ে ওঠে। দিনের শুরুতে কয়েক মিনিট নিজের জন্য রাখুন। ধীরে ধীরে শ্বাস নিন, শান্তভাবে বসুন কিংবা জানালার পাশে কিছুক্ষণ সময় কাটান।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকলে ঘুম, মনোযোগ ও স্মৃতির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
সকালের চাপ কমাতে কয়েকটি কাজ করতে পারেন—
- কয়েক মিনিট ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার অনুশীলন করুন।
- ঘুম থেকে উঠেই ফোনের নোটিফিকেশন দেখা থেকে বিরত থাকুন।
- সম্ভব হলে খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ হাঁটুন।
- পরিবারের সদস্য বা প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলুন।
- দিনের কাজ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করে একবারে একটি কাজের পরিকল্পনা করুন।
মনে রাখবেন, প্রতিদিন সকালে সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের জন্য শান্ত ও স্বস্তিদায়ক একটি পরিবেশ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
২. সকালে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দিনের পরিকল্পনা করুন
অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে কাজের চাপে ঢুকে পড়ার পরিবর্তে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে দিনের পরিকল্পনা করতে পারেন। কোন কাজগুলো জরুরি, কোনটি পরে করা যাবে এবং নিজের জন্য কতটুকু সময় রাখা সম্ভব—এসব ঠিক করে নিলে দিনের ব্যস্ততা সামলানো সহজ হয়।
সকালে নিজেকে একটি প্রশ্ন করতে পারেন—আজকের দিনটি কীভাবে আরও সুন্দর ও গোছানোভাবে কাটাতে পারি?
এরপর দিনের গুরুত্বপূর্ণ দুই-তিনটি কাজ লিখে রাখুন। কাজের তালিকা খুব বড় না করে বাস্তবসম্মত রাখুন। এতে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা কমতে পারে এবং মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।
দিনের পরিকল্পনায় কয়েকটি বিষয় রাখার চেষ্টা করুন—
- শরীরচর্চার জন্য কিছু সময়।
- সুষম খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা।
- কাজ বা পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমের ব্যবস্থা।
- মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিজের পছন্দের কোনো কাজ।
এই অভ্যাস আপনাকে নিজের সময় সম্পর্কে সচেতন হতে এবং কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে সাহায্য করবে।
৩. মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পড়ুন বা নতুন কিছু শিখুন
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে নিয়মিত মানসিক চর্চা করা উপকারী। সকালে কয়েক মিনিট বই পড়া, ডায়েরি লেখা, নতুন কোনো বিষয় শেখা কিংবা শব্দের ধাঁধা সমাধানের মতো কাজ করতে পারেন। এসব কাজ মনোযোগ ধরে রাখার অনুশীলন তৈরি করে এবং শেখার সুযোগ বাড়ায়।
সকালে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রথমেই দীর্ঘ সময় নির্ধারণ করার প্রয়োজন নেই। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট দিয়ে শুরু করতে পারেন। পছন্দের বই, সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদন কিংবা নতুন কিছু শেখার উপযোগী লেখা বেছে নিন।
এ ছাড়া একটি ছোট ডায়েরিতে প্রতিদিনের ভাবনা বা লক্ষ্য লিখে রাখতে পারেন। এতে নিজের চিন্তা গুছিয়ে নেওয়া এবং দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মনে রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
সকালের মানসিক চর্চাকে আরও কার্যকর করতে—
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কিছু পড়ুন।
- পড়ার সময় ফোন দূরে রাখুন।
- নতুন কিছু জানলে তা নিজের ভাষায় লিখে রাখুন।
- প্রতিদিন একটি ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন।
- কোনো ধাঁধা বা মস্তিষ্কের অনুশীলন ভালো লাগলে সেটিও রুটিনে রাখুন।
তবে শুধু ধাঁধা সমাধান করলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে বা বয়সজনিত স্মৃতির সমস্যা ঠেকানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত শেখা ও মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
৪. সকালে হাঁটুন বা শরীরচর্চা করুন
শরীর ভালো রাখতে যেমন ব্যায়ামের প্রয়োজন, তেমনি মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্যও নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কিংবা যোগব্যায়ামের মতো কাজ শরীরের রক্ত সঞ্চালন ও সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সকালে ব্যায়াম করলে অনেকের মন-মেজাজ ভালো থাকে এবং দিনের কাজ শুরু করার জন্য নিজেকে আরও প্রস্তুত মনে হয়। তবে ব্যায়ামের জন্য সকালই একমাত্র উপযুক্ত সময় নয়। দিনের যে সময়ে নিয়মিত শরীরচর্চা করা সম্ভব, সে সময়টিই বেছে নিতে পারেন।
অভ্যাস গড়ে তুলতে সকালে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। পরে নিজের সামর্থ্য ও সময় অনুযায়ী ব্যায়ামের সময় বাড়াতে পারেন।
শরীরচর্চার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন—
- নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম করুন।
- দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন।
- ব্যায়ামের আগে ও পরে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন।
- নতুন করে কঠোর ব্যায়াম শুরু করার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত ব্যায়ামকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করুন।
২০২৪ সালে জেরোসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং ও মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ব্যায়াম সবার স্মৃতিশক্তি একইভাবে বাড়াবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও প্রমাণ প্রয়োজন।
৫. পুষ্টিকর সকালের খাবার খান
রাতের ঘুমের পর দিনের কাজ শুরু করতে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। তাই সকালে ক্ষুধা লাগলে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন। সুষম খাবার শরীরের শক্তির চাহিদা পূরণ করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
সকালের খাবারে প্রোটিন, আঁশ, শর্করা, ভিটামিন ও খনিজের ভালো সমন্বয় রাখা যেতে পারে। যেমন—ডিম, দুধ বা টক দই, ওটস, আটার রুটি, ডাল, বাদাম এবং মৌসুমি ফল। খাবারের ধরন ও পরিমাণ নির্ভর করবে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, কাজের ধরন এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, পূর্ণশস্য, মাছ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবারসমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতেও সহায়ক হতে পারে।
সকালের খাবারে রাখতে পারেন—
- ডিম ও আটার রুটি।
- ওটসের সঙ্গে দুধ বা টক দই।
- মৌসুমি ফল ও অল্প পরিমাণ বাদাম।
- সবজি দিয়ে তৈরি খাবার।
- সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী মাছ বা ডাল।
চা বা কফি পান করলে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখুন। অতিরিক্ত ক্যাফেইন কারও কারও ক্ষেত্রে অস্থিরতা বাড়াতে কিংবা রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আবার সকালে নাশতা করলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। মূল বিষয় হলো সারাদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা।
বয়স বাড়লেও মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়া জরুরি
মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে কোনো নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ছোটবেলা থেকে শুরু করে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন কিছু শেখার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উপকার করতে পারে।
মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নিউরোপ্লাস্টিসিটি। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতা, শেখা ও অনুশীলনের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগে পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, যেকোনো বয়সে মস্তিষ্কের সব ধরনের ক্ষতি পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব।
ধূমপান এড়িয়ে চলা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঘুমের সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে কিংবা সমস্যা ক্রমে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ভালো রাখতে সকালের রুটিনে বড় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। কয়েক মিনিট শান্ত থাকা, দিনের পরিকল্পনা করা, কিছু পড়া, হাঁটাহাঁটি করা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মতো ছোট অভ্যাস দিয়েই শুরু করতে পারেন। নিয়মিতভাবে এসব অভ্যাস ধরে রাখাই সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্র: দ্য হেলথ