সম্পর্ক সুখী রাখতে চাই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতি। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিটি সম্পর্ক শুরু হয় ভালোবাসা আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। সময়ের সঙ্গে অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি ও একঘেয়েমি জমে অনেক সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। মনোবিদদের মতে, সদিচ্ছা ও সঠিক পদক্ষেপ থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক আবার প্রাণবন্ত করা সম্ভব।
প্রতিটি সম্পর্কের শুরুটা হয় এক বুক ভালোবাসা আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনেক সম্পর্কেই জমতে শুরু করে অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি আর একঘেয়েমির ধুলো। একসময়ের সুখী দম্পতিরা জড়িয়ে পড়েন অসুখী সম্পর্ক বা টক্সিক সম্পর্কে।
তবে আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, একটু সদিচ্ছা ও সঠিক পদক্ষেপ নিলে যেকোনো দূরত্ব মুছে সম্পর্ককে আবার সুখী ও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক সম্পর্কের ভাঙন রোধে ও হারানো সুখ ফিরিয়ে আনার কিছু উপায়।
দম্পতিরা কেন ঝগড়া করেন?
সংসারে খুটখাটো বিষয়ে মতের অমিল বা ঝগড়া হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। তবে ঝগড়ার মূল কারণ কিন্তু ঘরের কাজ বা বাইরের কোনো বাহ্যিক বিষয় নয়। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ দম্পতির ঝগড়ার মূল কারণ হলো—মানসিক সংযোগের অভাব এবং অনিরাপত্তা বোধ।
যখন একজন সঙ্গী অনুভব করেন যে অন্যজন তাঁকে যথেষ্ট মূল্য দিচ্ছেন না বা তাঁর আবেগকে অবহেলা করছেন, তখনই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঝগড়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ, ঝগড়া আসলে অপর সঙ্গীর দৃষ্টি আকর্ষণের এবং নিজের গুরুত্ব প্রমাণের একটি নেতিবাচক চেষ্টা মাত্র।
যে চার আচরণ ‘সম্পর্ক নষ্ট’ করতে পারে
বিখ্যাত সম্পর্ক গবেষক ড. জন গটম্যান চারটি নেতিবাচক আচরণকে সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক বা ‘ধ্বংসাত্মক’ বলে চিহ্নিত করেছেন:
সমালোচনা: সঙ্গীর কোনো নির্দিষ্ট ভুলের প্রতিবাদ না করে সরাসরি তাঁর চরিত্র বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে আক্রমণ করা। যেমন—‘তুমি সবসময় এমন করো’।
অবজ্ঞা: সঙ্গীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, চোখ বাঁকানো, উপহাস করা বা নিজেকে তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা। এটি সম্পর্কের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে ধ্বংস করে।
আত্মপক্ষ সমর্থনের মনোভাব: নিজের কোনো ভুল স্বীকার না করে উল্টো সঙ্গীর ওপর দোষ চাপানো বা অজুহাত তৈরি করা।
নীরবতা: ঝগড়া বা আলোচনার একপর্যায়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, কথা না বলে দেয়ালের মতো নীরব হয়ে যাওয়া।
সহানুভূতি পুনর্গঠন
অসুখী সম্পর্ককে সুখী করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সহানুভূতি বা এম্প্যাথি পুনর্গঠন করা। এর মানে হলো—নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সঙ্গীকে বিচার না করে, সঙ্গীর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে তাঁর মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা।
সঙ্গী যখন রেগে থাকেন বা মন খারাপ করেন, তখন পাল্টা যুক্তি না দেখিয়ে শান্ত হয়ে তাঁর কথা শুনুন। তিনি কেন এমন আচরণ করছেন, তাঁর ভেতরের কষ্টটা কোথায়—তা বোঝার চেষ্টা করাই হলো সহানুভূতির প্রথম ধাপ। সম্পর্কে যখন একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ফিরে আসে, তখন দূরত্বের দেয়ালগুলো আপনাআপনি গলতে শুরু করে।
নিজেদের স্বপ্ন বোঝা
অনেক সময় বছরের পর বছর একসাথে থাকার পরও দম্পতিরা একে অপরের সুপ্ত ইচ্ছা বা দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নগুলো জানতে পারেন না। সম্পর্ককে নতুন করে সুখী করতে হলে একে অপরের ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে হবে এবং শ্রদ্ধা করতে হবে।
সঙ্গীর ক্যারিয়ারের লক্ষ্য, কোনো শখ কিংবা জীবনের বড় কোনো ইচ্ছাকে ছোট করে না দেখে, কীভাবে দুজনে মিলে তা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা করুন। যখন একজন সঙ্গী বুঝতে পারেন যে অন্যজন তাঁর স্বপ্নের কদর করছেন, তখন সম্পর্কের গভীরতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ভালোভাবে বিচ্ছেদ
সবরকম চেষ্টার পরও যদি দেখা যায় যে সম্পর্কের টানাপোড়েন কোনোভাবেই কমছে না, বরং একসাথে থাকাটা দুজনের জন্যই চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—তখন জোর করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে ভালোভাবে বিচ্ছেদ বা সুন্দরভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া শ্রেয়।
একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বা তিক্ততা না বাড়িয়ে, কাটানো সুন্দর সময়গুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সমঝোতার মাধ্যমে আলাদা হওয়াটাই প্রাজ্ঞতার পরিচয়। বিশেষ করে যদি সংসারে সন্তান থাকে, তবে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে হলেও সুন্দর ও সম্মানজনক বিচ্ছেদ বেছে নেওয়া উচিত।
সম্পর্ক কোনো যন্ত্র নয় যে আপনাআপনি চলবে। সম্পর্কের ভুলগুলো চিহ্নিত করে দুজনে মিলে কাজ করলে যেকোনো অসুখী সম্পর্ককেই আবার ভালোবাসার স্বর্গে রূপান্তর করা সম্ভব।
ইমন/ডেইলি সান