ফ্রিজের বাসি খাবার বারবার গরম করা কতটা নিরাপদ?
জীবনযাপন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম
ফ্রিজ থেকে বের করা বাসি খাবার বারবার গরম করলেই তা পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয় না বলে সতর্ক করেছেন খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রতীকী ছবি
বারবার ভালো করে গরম করলেই বাসি খাবারের সব জীবাণু মরে না, বরং ভুল পদ্ধতিতে গরম করলে খাদ্য-বিষক্রিয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রচলিত একটি ভুল ধারণা রয়েছে—ফ্রিজের বাসি খাবার মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বা চুলায় বারবার ভালো করে ফুটিয়ে বা গরম করে নিলে ব্যাকটেরিয়া মরে যায় এবং খাবারটি আরও ৩-৪ দিন বেশি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তবে খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য-বিষক্রিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। ‘সেলফ ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, খাবার বারবার গরম করা কোনো ‘ম্যাজিক রিসেট বাটন’ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিনের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. বিল সালিভান জানান, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের কারণেই খাবারে বিষক্রিয়া বা ‘ফুড পয়জনিং’ ঘটে। রান্নার পর খাবার ঠান্ডা হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে যখন তাপমাত্রা ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (৪ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মধ্যে থাকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘ডেঞ্জার জোন’।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বিপজ্জনক তাপমাত্রায় কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া প্রতি ২০ মিনিটে নিজেদের সংখ্যা দ্বিগুণ করে ফেলতে পারে। খাবার যত বেশি সময় এই তাপমাত্রায় থাকে, ততই বেশি ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং তাপ-প্রতিরোধী বিষাক্ত স্পোর তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ড্যারিন ডেটউইলার ব্যাখ্যা করেন, খাবারকে ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় গরম করলে সাধারণ সক্রিয় ব্যাকটেরিয়া মারা যায় ঠিকই, তবে সব জীবাণু মরে না।
ভাতে থাকা ‘ব্যাসিলাস সিরিয়াস’ এবং মাংসে থাকা ‘ক্লস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিঞ্জেন্স’ ব্যাকটেরিয়ার স্পোর ও টক্সিন তাপ-প্রতিরোধী—ওভেনে গরম করলেও এরা অক্ষত থেকে যায়। এদিকে একটি বড় পাত্রের পুরো খাবার বারবার ফ্রিজ থেকে বের করা, গরম করা এবং আবার ঠান্ডা করে রাখার ফলে খাবার প্রতিবার নতুন করে ‘ডেঞ্জার জোন’ তাপমাত্রায় প্রবেশ করে। এই চক্রাকার অবহেলা খাবারের ভেতরে ক্ষতিকর টক্সিন বা দূষণের পুঞ্জীভূত ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ও বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিকা অনুযায়ী ফ্রিজের খাবার নিরাপদে খাওয়ার চারটি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো।
১. তিন থেকে চার দিনের সময়সীমা: এফডিএ-র নিয়ম অনুযায়ী, ফ্রিজের সাধারণ চেম্বারে রাখা বাসি খাবার সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে শেষ করা উচিত। এর চেয়ে বেশি দিনের পুরোনো খাবার গরম করলেও তা সম্পূর্ণ বিষমুক্ত হয় না।
২. শুধু প্রয়োজনীয় অংশ গরম করা: পুরো পাত্রের খাবার একসঙ্গে গরম করা ভুল অভ্যাস। প্রতিবার খাওয়ার সময় ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, শুধু ততটুকু খাবার আলাদা বাটিতে নিয়ে গরম করাই ভালো। বাকি খাবার পাত্রসহ সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে রেখে দেওয়া নিরাপদ।
৩. সঠিক তাপমাত্রা যাচাই: খাবার গরম করার সময় তা অন্তত ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়েছে কি না, তা খেয়াল রাখতে হবে। ডিজিটাল ফুড থার্মোমিটার দিয়ে যাচাই করে নেওয়া ভালো, খাবারের ভেতরের অংশও সমানভাবে গরম হয়েছে কি না।
৪. দীর্ঘায়ুর জন্য ফ্রিজিং: কোনো খাবার ৪ দিনের বেশি সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে, তা সাধারণ ফ্রিজে না রেখে ডিপ ফ্রিজে বাতাসহীন পাত্রে ভালোভাবে আটকে রাখতে হবে। ফ্রিজারের মাইনাস তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয়, যা খাবারকে বিষক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘকাল সুরক্ষিত রাখে।
যা মনে রাখা জরুরি
খাদ্যজনিত বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী কোনো ব্যাকটেরিয়াই খালি চোখে দেখা যায় না। তাই ফ্রিজে থাকা বাসি খাবারের ঘ্রাণ ঠিক থাকলেও, যদি তার রঙে সামান্য পরিবর্তন আসে, চটচটে বা পিচ্ছিল ভাব তৈরি হয়, কিংবা তা ৪ দিনের বেশি পুরোনো হয়ে থাকে—তবে গরম করে খাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ফেলে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।