তরুণদের ক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, মোতায়েন ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী
এক সপ্তাহ আগে দাঙ্গার ঘটনায় নতুন করে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও তরুণদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার প্যারিসে বড় সমাবেশের শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্যারিসে বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিনের শুরুতে মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ।
প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, বৃষ্টির মধ্যে ট্রামস্টপের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাস্তায় সংঘর্ষ দেখছিলেন কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তাঁদের একজন ২৩ বছর বয়সী মাইক। তরুণদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানাতে তিনি মিছিলে যোগ দেন।
পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক মাইক বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, ফ্রান্সের বয়স্ক জনগোষ্ঠী আমাদের অবহেলা করছে।’
বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছুড়লে পাল্টা ধাওয়া ও লাঠিপেটা শুরু করে পুলিশ। এতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে মাইক ও তাঁর বন্ধুরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
মাইক প্রশ্ন করেন, ‘চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, এরা তো কিশোর-কিশোরী। কিশোরদের কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করা কি স্বাভাবিক?’
২৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী জেসিকা, যিনিও পদবি প্রকাশ করতে চাননি, পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এতে বিক্ষোভ করার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
জেসিকা বলেন, ‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এত সহিংসতা কেন। আমার মনে হচ্ছে, প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে।’
এক সপ্তাহ আগে দাঙ্গার ঘটনায় নতুন করে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
প্যারিসের মূল মিছিলে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন বলে পৃথক হিসাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজক শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আন্দোলনটি শুরু হয়। প্রথমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দেশজুড়ে বিস্তৃত হয় এবং এতে আরও ব্যাপক মানুষের সমর্থন যুক্ত হয়।
শনিবারের বিক্ষোভের শুরুতে প্যারিসের পূর্বাঞ্চলের সড়ক ধরে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার সময় লাউডস্পিকারে ফরাসি পপসংগীত বাজছিল। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, আর পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর।
সাউথ পার্ক কার্টুনের কয়েকটি চরিত্রের ছবি এবং ‘তোমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছ, হারামজাদারা’ লেখা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিলেন লরেলেই ভ্যান ডার পুল। জনপ্রিয় ওই কার্টুনের একটি বিখ্যাত সংলাপের আদলে তৈরি প্ল্যাকার্ডটি দেখে কয়েকজন থেমে হাসেন এবং ছবি তোলেন।
বহুতল আবাসিক ভবনের জানালা থেকে বাসিন্দারা মিছিলকারীদের উদ্দেশে উল্লাস প্রকাশ করেন। জবাবে বিক্ষোভকারীরাও উচ্ছ্বাসে সাড়া দেন। রাস্তায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচের ছোট ছোট আসরও বসে।
তবে মিছিলের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সেখানে সারি সারি পুলিশ সদস্য ও পুলিশের ভ্যান অপেক্ষা করছিল। এএফপির এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলে দেখেন, পুলিশ বারবার বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ছিলেন তরুণ।
প্রথম নাম প্রকাশ করা ডেভিড নামের এক বিক্ষোভকারীকে তখন বিচলিত দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখে কাটা দাগ ছিল। তিনি বলেন, এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর দিকে লাঠি ছুড়ে মারলে তিনি আহত হন।
ডেভিড বলেন, ‘পুলিশ সবার দিকে এগিয়ে এসে নিচু হতে ও পেছনে সরে যেতে বলছিল। তারা মানুষকে ফেলে দিচ্ছিল, বিক্ষোভকারীদের মারধর করছিল।’
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ রাস্তাঘাট খালি করতে শুরু করে এবং বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে থাকেন।
সহিংসতার ঘটনায় হতাশ হলেও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পে অটল রয়েছেন জেসিকা। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সবাই লড়ছি।’
তাঁর বন্ধু ২৪ বছর বয়সী ব্রায়ানও একই রকম দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি শনিবার আসতে হলে আমরা প্রতি শনিবারই এখানে থাকব।’
-6add0ced10c80.jpg)