ভূরাজনীতি ও জ্বালানি কূটনীতি
আম্বানির জামনগর তেল শোধনাগারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ পিএম
মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্স। ছবি: আল জাজিরা
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য, রুশ তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে ভারতের গুজরাটের জামনগরে বিশ্বের বৃহত্তম একক তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্স ঘিরে এ সফর অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন প্রশাসন জামনগর শোধনাগারকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই সফরে উপস্থিত ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। জামনগরে পৌঁছালে রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি ও অনন্ত আম্বানি সহ পরিবারের উচ্চপদস্থ সদস্যরা তাঁদের স্বাগত জানান।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের বরাত দিয়ে আল জাজিরার জানিয়েছে, গত মাত্র এক বছরে ভারতের সামগ্রিক এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১০ শতাংশের কম থেকে লাফিয়ে ৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
পাশাপাশি, টেক্সাসের ব্রাউনসভিল বন্দরে রিলায়েন্সের প্রস্তাবিত ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের নতুন শোধনাগার প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। ২০২৯ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা থাকা এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে দীর্ঘ পাঁচ দশকের মধ্যে মার্কিন মাটিতে নির্মিত প্রথম কোনো বৃহৎ তেল শোধনাগার।
জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্সের দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা রয়েছে, যা বৈশ্বিক পরিশোধনের প্রায় ১.৫ শতাংশ। ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল পরিশোধনে সক্ষম এই কমপ্লেক্সটি বিশ্ববাজারে পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল সরবরাহের মূল চালিকাশক্তি।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ ও ডিজেল সরবরাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে এই শোধনাগার বড় ভূমিকা রাখছে। কেপলারের তথ্যমতে, এই শোধনাগারে ভেনেজুয়েলা থেকে দৈনিক প্রায় ৩.৫ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতায় পরিণত হয়। ২০২৫ সালে রিলায়েন্সের আমদানিকৃত তেলের প্রায় অর্ধেকই ছিল রুশ উৎসের। এর জেরে ২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপ করলে রিলায়েন্স রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমায়।
তবে এখনো জামনগরের এক-তৃতীয়াংশ তেল রুশ উৎস থেকেই আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও স্বীকার করেছেন যে, ভারতের পক্ষে রাতারাতি রুশ তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো অসম্ভব, তবে তারা উৎস বৈচিত্র্যময় করছে।
একদিকে যখন মার্কিন প্রশাসনের সাথে আম্বানির সুসম্পর্ক চলছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্কের সাথে আম্বানির ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভারতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট লাইসেন্স নিয়ে মাস্কের অভিযোগ— আম্বানির 'জিও'-কে একচেটিয়া সুবিধা দিতে স্টারলিংককে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য রিলায়েন্স এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, তারা সুস্থ প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানায়।
সব মিলিয়ে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জামনগর সফর কেবল একটি শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন নয়, বরং এটি রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ভেনেজুয়েলার জ্বালানি বাজারের সমীকরণ এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্কের এক নতুন কৌশলগত অধ্যায়।