কংগ্রেস হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা, ক্ষমতা ধরে রাখতে ট্রাম্পের নতুন কৌশল
মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট রক্ষায় জোর, ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে নিজেই প্রচারে নামছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কার মধ্যে অন্তত সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউস। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রচার জোরদার, ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে, অন্যদিকে সিনেটের লড়াই তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলেও ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা পুরোপুরি সীমিত হয়ে যাবে, এমন নয়।
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হবে। বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারলে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের কার্যক্রম তদারকির ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
ভোটারদের কেন্দ্রে আনাই ট্রাম্পের লক্ষ্য
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নিজে প্রার্থী না হলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও নীতির প্রভাব দলীয় প্রার্থীদের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় করতে ট্রাম্প নিজেই প্রচারে জোর দিচ্ছেন।
রয়টার্সের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ট্রাম্প দলের কৌশল, প্রচারের অর্থ ব্যয় এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সমালোচনা করছেন। একই সঙ্গে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছেন, যেন ব্যালটে তাঁর নিজের নামও রয়েছে।
রিপাবলিকানদের হিসাব, ট্রাম্পের সমর্থকদের বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে দলের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপণ্যের দাম এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
হাউসের চেয়ে সিনেট রক্ষায় বেশি গুরুত্ব
প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের পরিবর্তনেই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ বদলে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের অনুমোদনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেলে প্রশাসনের নিয়োগ ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগে বাধা দেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে পররাষ্ট্রনীতি ও নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থেকে যাবে।
নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচনের আগে ভোটের নিয়ম ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প ভোটার নিবন্ধনে নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ভোট দেওয়ার সময় পরিচয়পত্র দেখানোর মতো কঠোর শর্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পাশাপাশি ডাকযোগে ভোটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগও তাঁর নির্বাচনী আলোচনার অংশ।
এ বিষয়ে তাঁর সমর্থকদের যুক্তি, কঠোর পরিচয় যাচাই নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, অতিরিক্ত শর্তের কারণে যোগ্য ভোটারদের একটি অংশ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, ফেডারেল নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারণে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট এককভাবে নির্বাচনী নিয়ম নির্ধারণের অসীম ক্ষমতা রাখেন না; এ ক্ষেত্রে আইন ও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্পের সমর্থকদের কাছে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বিরোধীদের মতে, নির্বাচন নিয়ে প্রমাণহীন অভিযোগ জনমনে অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। ফলে ভোটের আগে নির্বাচনী নিয়মের পাশাপাশি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
কংগ্রেস হারালেও থামবে না ট্রাম্পের এজেন্ডা
কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়ন কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কংগ্রেসনাল তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই প্রেসিডেন্টের সব নীতি বন্ধ হয়ে যাবে না। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইন প্রণয়নে বাধার মুখে পড়লে ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী আদেশ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিদ্যমান আইনে দেওয়া ক্ষমতার ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে তদন্ত ও তদারকির ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে পারবেন। তবে তদন্তের ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনের সহযোগিতার ওপর।
সামনে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না; এটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করবে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের আসন কমে গেলে ট্রাম্পের নীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করলে কংগ্রেসে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় কৌশল নির্ধারণের সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—রিপাবলিকান ভোটারদের সক্রিয় রাখা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ মোকাবিলা করা। নির্বাচনের ফল কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন ট্রাম্পের প্রশাসনিক ক্ষমতা কতটা সীমিত করবে, তা নির্ভর করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর।
সূত্র: রয়টার্স, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন ও চ্যাথাম হাউস।