জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপুষ্টি ও বেকারত্বে বহুমুখী সংকটে পাকিস্তান
পাকিস্তানে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছালেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩১ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বহুমুখী সংকটে পড়েছে পাকিস্তান। পর্যাপ্ত চাকরি না থাকায় হতাশ হয়ে পড়ছেন তরুণেরা; অনেকে উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং কৃষিতে লোকসান দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পাকিস্তানে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছালেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
জুলাইয়ের শেষ দিকে ইসলামাবাদে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের এক সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেন, তরুণেরা একজোট হলে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। তাই মেধার ভিত্তিতে তাঁদের চাকরি ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বর্তমান ব্যবস্থা ও অর্থনীতি সংকটের মুখে রয়েছে।
প্রতি বছর দেশটিতে আনুষ্ঠানিক খাতে যত কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তার চেয়ে অন্তত ১০ লাখ বেশি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছান। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে বাড়তি জনসংখ্যার চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে উঠছে।
শিক্ষায় সংকট, এআই প্রশিক্ষণে নতুন উদ্যোগ
পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও অর্থায়নের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির ৭৭ শতাংশ শিশু ১০ বছর বয়সেও বয়সোপযোগী লেখা পড়তে পারে না। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের পাঠদানের দক্ষতা বাড়াতে সিন্ধু প্রদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রশিক্ষণ চালু হয়েছে।
শিক্ষা প্রযুক্তিবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা তালিমাবাদের তৈরি ‘রুমি’ নামের একটি টুল ব্যবহার করে শিক্ষকেরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের পাঠদানের মূল্যায়ন ও উন্নতির পরামর্শ পাচ্ছেন। বর্তমানে সিন্ধু প্রদেশে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় দুই ডজন শিক্ষক এটি ব্যবহার করছেন।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মৌলিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানে শিক্ষার মোট ব্যয় ২৮৯ বিলিয়ন রুপি কমে ৯৬২ বিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মীদের বেতন ও পেনশনে।
খাদ্যসংকটে বাড়ছে শিশুদের অপুষ্টি
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে পাকিস্তানের অনেক পরিবার পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারছে না। এতে শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। দেশটিতে মাঝারি ও গুরুতর খাদ্যসংকটে থাকা পরিবারের হার ২০১৯ সালের ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৪ শতাংশ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে অপুষ্টি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশুদের জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে পুষ্টিকর খাবার ও নগদ সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কৃষিতে লোকসান, শহরমুখী তরুণেরা
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ফসলের ক্ষতি ও ঋণের চাপে পাকিস্তানের কৃষকেরাও সংকটে রয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে আয়ের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক তরুণ জীবিকার সন্ধানে শহরে পাড়ি দিচ্ছেন।
দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গ্রামাঞ্চলের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলেন, যা ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাকিস্তানের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
তবে কাজের সংকটের মধ্যেও কেউ কেউ এআই ব্যবহার করে অনলাইনে আয়ের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। ২১ বছর বয়সী মুহাম্মদ ফুরকান চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও অন্যান্য এআই টুল ব্যবহার করে ইউটিউবের জন্য উর্দু ভাষায় ইসলামি ও পাকিস্তানের ইতিহাসভিত্তিক ভিডিও তৈরি করেন। এ কাজ থেকে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৬০০ ডলার। ভবিষ্যতে নিজের সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে অন্য তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
রাজনৈতিক অসন্তোষ ও দেশ ছাড়ার প্রবণতা
পাকিস্তানে তরুণদের রাজনৈতিক অসন্তোষও বাড়ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থকদের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার এবং সামরিক বাহিনীর সমালোচনার অভিযোগে দণ্ড দেওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভার্সো কনসালটিংয়ের পরিচালক আজিমা চিমার মতে, তরুণেরা নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন। এতে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের আশঙ্কা সত্ত্বেও অনেকে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়তে চাইছেন অনেক তরুণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাত লাখের বেশি পাকিস্তানি বৈধ পথে কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের অধিকাংশই উপসাগরীয় দেশগুলোতে নির্মাণ ও সেবাখাতে কাজ করেন।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ছিল ৪১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়লে দেশটি দক্ষ ও মেধাবী কর্মী হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংস্কারই বড় চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তানে উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, কম মজুরি ও ব্যবসায়িক জটিলতা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সহজে ঋণ না পাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।