সৌদির আরামকোতে হুথিদের হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর দহরানে এ হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে আরামকোর স্থাপনায় হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করে সেগুলোর আশপাশ থেকে কর্মচারী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পরই দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে।
সানার আল-সাবাহ এলাকায় ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির একটি কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা খালি করার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের নির্দেশের পর হুথিদের পক্ষ থেকে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। হুথি মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে এর ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে।
রিয়াদ অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র, আহত চার
এসপিএ জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বাহিনী। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১৫টি ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার দহরানের আরামকো সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগারের আশপাশ থেকে সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে জোট বাহিনী।
সানার তেল স্থাপনায় সৌদি জোটের হামলা
সানার একটি তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই সেখানে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানি এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের মজুতাগারগুলো আগেই খালি করা হয়েছিল। ফলে হামলার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় সানার বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি বলেন, সানার কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনায় বিমান হামলার পরপরই তাঁরা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
তিনি আরও জানান, সৌদি আরব লোহিত সাগরের রাস ঈসা বন্দরেও বিমান হামলা চালিয়ে জ্বালানি তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, হুথিরা এসব স্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল।
বিস্ফোরণের পর হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সানায় সৌদি জোটের সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে ইয়েমেনি যোদ্ধাদের তীব্র লড়াই চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সৌদি জোট সানায় হামলা অব্যাহত রাখলে আগে থেকে খালি করার নির্দেশ দেওয়া এলাকাগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
বিমানবন্দরে হামলার পর ফ্লাইট স্থগিত
রিয়াদের বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। গত শনিবারের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আরও একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
এসব ঘটনার পর এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে হুথি মুখপাত্র দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দর সম্পর্কেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
এসপিএ জানায়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার জন্য তাদের ‘চড়া মাশুল’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
হুথিদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মন্তব্য
মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেন, তারা ‘খুবই বাজে আচরণ’ করছে। সৌদি আরবের স্বার্থ সুরক্ষায় ইয়েমেন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে অনুরোধ জানাতে পারেন বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি বললে প্রেসিডেন্ট এরদোগান এটি করবেন।’
ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান, বাড়ছে সংঘাত
ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বিমান সহায়তা দিচ্ছে রিয়াদ।
ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর দাবি, মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের বিভিন্ন ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একযোগে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তায়েজ গভর্নরেটে মোট নয়টি হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে ডুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলা হয়েছে।
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্র জানিয়েছে, তায়েজের দক্ষিণে আল-শাগাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।
এদিকে মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম’ মঙ্গলবার অভিযোগ করে, গত ২৪ ঘণ্টায় তায়েজে হুথিদের গোলাবর্ষণে পাঁচ বছরের এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত সাতটি ঘরবাড়ি। সংস্থাটির দাবি, এক দিনেই তায়েজজুড়ে ১৮০টির বেশি গোলা নিক্ষেপ করেছে হুথিরা।
গত সেপ্টেম্বর মাসে মোখা বন্দরের দিকে আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে সরকারি বাহিনীকে সেখান থেকে হটিয়ে দেয় হুথিরা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই মাসে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণও নেয় গোষ্ঠীটি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে মায়্যুন দ্বীপ অবস্থিত।
যুদ্ধবিরতির আহ্বান রেড ক্রসের
ইয়েমেনে সংঘাতের অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিক। তিনি সংঘাতের সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইয়েমেনের এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাঁদের বড় একটি অংশ শিশু। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর থেকে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।