ফ্রান্সের বিক্ষোভ ইউরোপের জন্য কতটা উদ্বেগের?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম
ফ্রান্সে নজিরবিহীন শিক্ষার্থী বিক্ষোভ, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনৈতিক চাপ আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বড় বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যখন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে, তখন বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবিতে সামাজিক অসন্তোষও বাড়ছে।
ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ ইতিমধ্যে দেশটির বন্ডবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার প্রায় ৭০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। জার্মানির বন্ডের সঙ্গে ফরাসি বন্ডের সুদহারের ব্যবধানও ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ফ্রান্সের অর্থনীতি ও সরকারি ঋণবাজারের আকার এত বড় যে দেশটির আর্থিক সংকট অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পরিস্থিতি এখন শুধু ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
বাড়ছে ঋণের বোঝা
ফ্রান্সের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যে দেশটির মোট অর্থনীতির আকার ছাড়িয়ে গেছে। জুনে সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। এর সঙ্গে বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও গত বছরের তুলনায় কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
সরকারের ব্যয়ের চাপও বাড়ছে। জনসংখ্যার বয়স বাড়ায় পেনশন খাতে ব্যয় বাড়ছে। একই সময়ে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে ফ্রান্স।
শিক্ষা খাতেও সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়েছে। দেশটির উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ এবং জরাজীর্ণ স্কুল অবকাঠামো সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে।
ফলে একদিকে বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচনের চাপ, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছে ফরাসি সরকার।
বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্যোগে সামাজিক চাপ
ফ্রান্সে সরকারি ব্যয় কমানো বা রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ অতীতেও বড় ধরনের সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।
এবারও বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচন ও কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় এসব পদক্ষেপ কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহ্যাম মনে করেন, নির্বাচনের আগে আইনপ্রণেতারা সরকারের আর্থিক সংস্কারের প্রস্তাব দুর্বল করে দিতে পারেন। এতে ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষে দেশটির অর্থনৈতিক নীতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের কেনিংহ্যামের মতে, নির্বাচনের পর সরকারের আর্থিক নীতিতে আরও জনতুষ্টিবাদী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এতে ফরাসি সরকারি বন্ডের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দেশটির ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি সরকারি অর্থব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে বড় ধরনের ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে দলটি উল্লেখযোগ্য কর কমানোর অবস্থানও ধরে রেখেছে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থব্যবস্থায় এর সামগ্রিক প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফরাসি বন্ডবাজারে চাপ
ফ্রান্সের সম্ভাব্য ঋণসংকট নিয়ে উদ্বেগ সম্প্রতি আরও বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ফরাসি সরকারি বন্ড বিক্রি শুরু করায় বন্ডের দাম কমেছে এবং সুদহার বেড়েছে।
ফরাসি ও জার্মান ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহারের ব্যবধান ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজারে এই ব্যবধানকে ফ্রান্সের ঋণঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়।
সহজভাবে বললে, জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সের ঋণকে বিনিয়োগকারীরা এখন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। ফলে ফরাসি সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
অক্টোবরের শুরুতে দুই দেশের বন্ডের সুদহারের ব্যবধান প্রায় ১৬০ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছেছিল। একই সময়ে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে।
ইউরোপের অন্য দেশেও উদ্বেগ
ফরাসি বন্ডবাজারের অস্থিরতা ইউরোপের অন্যান্য ঋণবাজার নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশের সরকারি ঋণ বেশি, তাদের বন্ডে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যাঞ্জেল তালাভেরা মনে করেন, ইউরোপীয় অর্থনীতিতে ফ্রান্সের আকার ও গুরুত্বের কারণে দেশটির সংকট অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখনো ২০১০-এর দশকের শুরুতে গ্রিস ও ইতালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া ইউরোজোনের ঋণসংকটের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তারপরও ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতির দেশে দীর্ঘস্থায়ী ঋণসংকট তৈরি হলে এর প্রভাব একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।
ইউরোর ওপরও চাপ
ফ্রান্সের ঋণ নিয়ে উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে ইউরোর ওপরও। গত সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায় এবং সাময়িকভাবে ১ দশমিক ১২ ডলারের নিচে চলে যায়।
বুধবারও ফরাসি বন্ডবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ায় ইউরো ১৭ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ের দিকে নেমে যায়। একই সময়ে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহারও দ্রুত বাড়ে।
বাজারে আশঙ্কা, ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইউরোজোনের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা উচ্চ সুদ
ফ্রান্সের সংকট এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউরোপের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ, ইউরোপীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং জার্মানিতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মতো বিষয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফিরিয়েছে।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, গত মাসে ইউরো অঞ্চলের উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম প্রায় সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বেড়েছে।
মরগ্যান স্ট্যানলির অর্থনীতিবিদেরা সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এক বিশ্লেষণে বলেছিলেন, ইউরোপের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে এবং অঞ্চলটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে।
তবে সরকারি বন্ডের উচ্চ সুদহার এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
বাড়বে ঋণ নেওয়ার খরচ
সরকারি বন্ডের সুদহার বাড়লে তার প্রভাব শুধু সরকারের ওপর পড়ে না; সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যায়।
নেদারল্যান্ডসের ব্যাংক আইএনজির ম্যাক্রোইকোনমিকস বিভাগের প্রধান কার্স্টেন ব্রজেস্কির মতে, সরকারগুলো ব্যয় কমাতে না পারলে সুদের হার আরও বাড়তে পারে।
উচ্চ সুদহারের কারণে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়। ফলে বাড়ি ও গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিনিয়োগও কমে যেতে পারে।
সরকারের জন্য নতুন ঋণ নেওয়াও তখন কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়লে সরকারকে আরও ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হতে পারে, যা আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সরকারি বন্ডের সুদহার বহু বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফলে ইউরোপের দেশগুলোর সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ফ্রান্সের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ সামলে সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না।
একদিকে বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচন জরুরি, অন্যদিকে এমন পদক্ষেপই সামাজিক অসন্তোষ বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থান।
বাজার ইতিমধ্যে ফ্রান্সের ঋণের জন্য বাড়তি ঝুঁকি-প্রিমিয়াম দাবি করছে। বুধবার দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উঠে যায়।
ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এম্যানুয়েল মুলাঁ অবশ্য বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সহায়তা প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, সমাধান ফ্রান্সের নিজস্ব আর্থিক নীতির মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগের জায়গাটি স্পষ্ট—ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতির সরকারি ঋণবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তা ইউরোপের অন্যান্য ঋণবাজার, ইউরো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ফলে ফ্রান্সের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট এখন আর শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর গতিপথ ইউরোপের আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএনএন