EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

গায়িকা থেকে চীনের ফার্স্ট লেডি: কে এই পেং লিউয়ান?

সুর ও মার্জিত ব্যক্তিত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বমঞ্চে নজর কাড়ছেন তিনি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

গায়িকা থেকে চীনের ফার্স্ট লেডি: কে এই পেং লিউয়ান?

ওয়াশিংটনে শিশুদের ঐতিহ্যবাহী চীনা সংগীত পরিবেশনা দেখে হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিউয়ান। ছবি: রয়টার্স

অ অ

সামরিক বাহিনীর একজন সাধারণ ‘সোপ্রানো’ গায়িকা থেকে পরাশক্তি চীনের ফার্স্ট লেডি—পেং লিউয়ানের জীবনকাহিনি যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘদিনের চেনা প্রথা ভেঙে তিনি নিজেকে কেবল রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজস্ব মেধা, মার্জিত ব্যক্তিত্ব এবং সুরের জাদু দিয়ে বিশ্বমঞ্চে চীনের এক নমনীয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট-এ এক অনন্য মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব। মার্কিন তরুণদের একটি দল যখন চীনের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ‘জেসমিন ফ্লাওয়ার’ পরিবেশন করছিল, তখন ফার্স্ট লেডি কেবল নীরব শ্রোতা হয়ে থাকেননি; নিজেও মেলালেন সুর। বাণিজ্য যুদ্ধ আর রাজনৈতিক তিক্ততার প্রাচীর ভেঙে সুর ও কথার এই ‘সফট পাওয়ার’ দিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন আমেরিকার মানুষের মন। গান শেষে মার্কিন শিশুদের আবেগঘন ‘ধন্যবাদ, মা পেং!’ ডাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) শেয়ার করেছেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত সিয়ে ফেং।

১৯৬২ সালে চীনের শানদং প্রদেশের এক সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মী পরিবারে জন্ম নেন পেং লিউয়ান। তার মা ছিলেন স্থানীয় একজন অপেরা শিল্পী। মায়ের অনুপ্রেরণায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি শানদং আর্টস ইউনিভার্সিটিতে ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন।

১৯৮০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পেং লিউয়ান চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মিতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। তবে তার অসাধারণ কণ্ঠের কারণে দ্রুতই তাকে সেনাবাহিনীর সংগীত ও সাংস্কৃতিক দলের প্রথম সারির ‘সোপ্রানো’ (উচ্চ স্বরের গায়িকা) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সংগীত ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য চীনের সামরিক বাহিনীতে বর্তমানে তার পদমর্যাদা একজন মেজর জেনারেলের সমতুল্য।

১৯৮২ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি-র ঐতিহ্যবাহী ‘নিউ ইয়ার গালা’ অনুষ্ঠানে গান গেয়ে রাতারাতি পুরো চীনে তারকা বনে যান তিনি। এরপর কয়েক দশক ধরে তিনি চীনের অন্যতম শীর্ষ লোকসংগীত শিল্পী হিসেবে রাজত্ব করেন।

যখন স্ত্রীর পরিচিতি ছিল স্বামীর চেয়েও বেশি

১৯৮৬ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে তৎকালীন ফুজিয়ান প্রদেশের উদীয়মান কমিউনিস্ট নেতা শি জিনপিংয়ের সাথে পেং লিউয়ানের পরিচয় হয়। প্রথম স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের পর এটি ছিল শি জিনপিংয়ের দ্বিতীয় বিয়ে। ১৯৮৭ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

মজার ব্যাপার হলো, বিয়ের পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শি জিনপিংয়ের চেয়ে পেং লিউয়ান চীনের মানুষের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ ছিলেন। এই দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান শি মিংজে আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

চিয়াং ছিং-এর কালো অধ্যায়

কমিউনিস্ট চীনের ইতিহাসে গত কয়েক দশকে কোনো শীর্ষ নেতার স্ত্রীকেই এভাবে প্রচারের আলোয় আসতে দেখা যায়নি। এর পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ভীতি।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চীনের কুখ্যাত ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর নেপথ্যে থাকা ‘গ্যাং অফ ফোর’-এর অন্যতম নেত্রী ছিলেন মাও সে-তুং-এর স্ত্রী চিয়াং ছিং। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী চিয়াং ছিং-কে ১৯৮১ সালে মৃত্যুদণ্ড (যা পরে স্থগিত হয়) দেওয়া হয়। তার এই নেতিবাচক অধ্যায়ের পর চীনের পরবর্তী সব ফার্স্ট লেডিরাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা পছন্দ করতেন।

তবে ২০১৩ সালে শি জিনপিং চীনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পেং লিউয়ান সেই দীর্ঘদিনের নীরবতা ও ভীতি ভাঙেন। তিনিই চীনের প্রথম আধুনিক ফার্স্ট লেডি, যিনি স্বামীর সাথে সমান্তরালভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অংশ নিচ্ছেন।

বিশ্বমঞ্চে অনন্য

সফরে পেং লিউয়ানের পোশাক ও ব্যক্তিত্ব বিশ্বমঞ্চে সবসময়ই আলাদা নজর কাড়ে। চীনের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের আধুনিক ফিউশন পরে আন্তর্জাতিক মহলে তিনি ফ্যাশন আইকন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কোনো দোভাষীর সাহায্য ছাড়াই তিনি মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে মুগ্ধ করেছেন সবাইকে।

পেশাদার সংগীতের পাশাপাশি তিনি একজন সমাজকর্মীও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যক্ষ্মা ও এইডস সচেতনতা বিষয়ক শুভেচ্ছা দূত হিসেবে বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন তিনি।

কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মার্কিন কিশোর-কিশোরীদের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় যেভাবে তিনি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, তা দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের মাঝেও বন্ধুত্বের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। মার্কিন শিশুদের মুখে প্রোটোকল ভাঙা ‘মা পেং’ ডাক শুনে তার আনন্দের হাততালিই প্রমাণ করে—তিনি শুধু পরাশক্তির ফার্স্ট লেডিই নন, বরং দুই দেশের সাংস্কৃতিক দূরত্বের প্রাচীর ভেঙে দেওয়া এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

ইমন/ডেইলি সান

আরও পড়ুন