EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে?

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ এএম

হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাঞ্চলে হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত হুথিবিরোধী জোট ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ওই এলাকার উল্লেখযোগ্য অংশ হুথিদের দখলে চলে গেছে।

কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বা ৮১ মাইল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

এটি কয়েক বছরের মধ্যে হুথিদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের পরও হুথিরা যে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

হুথিদের প্রতিপক্ষ বর্তমানে অনেকটাই হতভম্ব ও মনোবলহীন। ফলে অদূর ভবিষ্যতে তাদের দখল করা এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, হুথিরা এখন দখল করা এলাকায় অবস্থান শক্ত করবে। তাদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দিতে হলে প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি সামরিক ও অর্থনৈতিক খরচ করতে হবে।

তবে হুথিরা এই অগ্রযাত্রায় একা নয়। ইয়েমেনের হুথিরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে। ইরানের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অন্যান্য অংশ—লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের—অভিজ্ঞতা ও পরাজয়ের পর হুথিদের প্রতি তেহরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হিশাম আল-ওমেইসি বলেন, এ কারণেই ইরান হুথিদের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে হুথিদেরও এই সমর্থন এখন আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, হুথিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝা যাবে না। হুথিদের নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর সাত মাস পর তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে।

এর একটি হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে থাকা হরমুজ প্রণালি। অন্যটি হলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালি।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, ইরান এখন সরাসরি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।

তার মতে, বিশ্বের জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশের বেশি এসব পথের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়লে তার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, এর প্রভাব একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের মতোই বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

হুথিরা যদি লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপ করার তাদের সক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে। এর মধ্যে পেরিম দ্বীপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলকে ঘিরে হুথিদের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট আক্রমণকারী নৌযানের কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, বাব আল-মান্দাব দিয়ে সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া ও আসা জাহাজের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হুথিদের আগেও ছিল। তবে এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর সরাসরি নজরদারির সুযোগ থাকা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে।

শুক্রবার বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যেসব কোম্পানির জাহাজ সৌদি আরবের নয়, তাদের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ।

তবে সৌদি জাহাজগুলো এরই মধ্যে হুথিদের অবরোধের আওতায় রয়েছে। ফলে হুথিদের এই বক্তব্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ রয়েছে।

এর আগে হুথিরা দাবি করেছিল, তারা শুধু ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের হামলার শিকার হয়েছে এমন জাহাজও, যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে একটি নরওয়েজীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে আইওনা ক্রেগ মনে করেন, হুথিরা এবার নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা বড় মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর মতো অভিযানের পুনরাবৃত্তি চাইবে না।

ক্রেগ বলেন, হুথিরা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখেছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি জড়াতে চাইবে কি না।

ইরানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে নতুন করে আরেকটি সংঘাতমুখী পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ট্রাম্পের জনসমর্থন বা নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করবে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দাব প্রণালির সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে সম্ভাব্য হুথি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্যাটেলাইট চিত্রও সামনে এসেছে। এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করতে পারে।

এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইরান সরাসরি এসব হামলার নির্দেশ না দিলেও এর সুফল তেহরান পাবে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর জুলাইয়ে ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাত বৃদ্ধি শুরু হয়।

তার মতে, হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসার পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে।

শাইবান বলেন, এরপর থেকেই স্পষ্টভাবে মনে হয়েছে যে ইরান এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এদিকে ইয়েমেন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সৌদি আরব লোহিত সাগরে তাদের অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক একটি মাত্রা পেয়েছে।

হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের গতিপথই বদলে দিতে পারে না, বরং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরান ও তাদের মিত্রদের প্রভাব বাড়তে থাকলে বিশ্ববাজারে তেল ও জ্বালানির দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য। দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, দরিদ্র ও খাদ্যসংকটে পড়েছে। নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ফলে হুথিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রা শুধু একটি সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক তেল ও নৌবাণিজ্যের ভবিষ্যৎও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

সূত্র: বিবিসি 

আরও পড়ুন