দুই বছর পর গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার প্রায় ১০০ লাশ
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনির লাশ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ স্বজনদের লাশের অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারগুলোর সদস্যরা।
শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেইতুন এলাকায় ইমাম আল-শাফি মসজিদের কাছে উদ্ধার করা লাশ ও দেহাবশেষগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় লাশগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা এবং সেগুলোর ওপর ফিলিস্তিনি পতাকা দেওয়া হয়। স্বজনেরা মোমবাতি জ্বালিয়ে ও ফুল দিয়ে নিহতদের শেষ শ্রদ্ধা জানান।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা সম্প্রতি রহিম, বালাওয়ি, মালাকা ও কানবুর পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর থেকে এসব লাশ উদ্ধার করেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধারে চলমান বিশেষ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এসব লাশ উদ্ধার করা হয়।
তবে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার কারণে উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে অল্প কয়েকটি খননযন্ত্র ও পুরোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা।
‘আমার পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে’
নিহত স্বজনদের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মরিয়ম হাসান আল-বালাওয়ি। তাঁর পাশে ছিলেন একমাত্র জীবিত মেয়ে মালাক।
মরিয়ম বলেন, ‘আমার স্বামী ও সন্তানরা নিহত হয়েছেন। আমার একমাত্র বেঁচে থাকা মেয়ে মালাক ছাড়া আর কেউ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমার পুরো জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। আমার স্বামী নেই, সন্তানরা নেই। আমার আর কোনো জীবন নেই।’
মরিয়ম জানান, তাঁর মেয়ে মালাক এখনো প্রতিদিন বাবা ও ভাই-বোনদের কথা মনে করে কাঁদে। তিনি বলেন, ‘আমি কী করব? আমার ঘর নেই, সন্তান নেই, জীবন নেই।’
তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনদের লাশ উদ্ধার হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন তিনি। মরিয়ম বলেন, ‘তাদের যখন বের করে আনা হলো, মনে হলো আমার বুকটা একটু হালকা হয়েছে। মনে হলো তাদের সঙ্গে আমার আত্মারও কিছুটা ভার বের হয়ে গেছে।’
৩২ স্বজন হারালেন জাদাল্লাহ
ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাদাল্লাহ রহিম। সেখানে তাঁর পরিবারের ৩২ সদস্যের লাশ ও দেহাবশেষ ছিল। ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই বাড়িতে হামলা হলে তাঁরা সবাই নিহত হন।
জাদাল্লাহ জানান, নিহতদের মধ্যে ১৫ জনের বেশি শিশু এবং প্রায় ১০ জন নারী ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘তাদের একমাত্র অপরাধ ছিল তারা নিজেদের বাড়িতে ছিল। হঠাৎ তাদের বাড়িতে বোমা হামলা হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে সবাই মারা যায়।’
সেদিন বাড়িটির ভেতরে মোট ৩৩ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন বেঁচে যায়—কাছেই থাকা একটি ছোট মেয়ে।
জাদাল্লাহ বলেন, ‘ও ছিল ৩৩ নম্বর ব্যক্তি। একমাত্র সে-ই বেঁচে গেছে।’
গাজার সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধার কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে গাজা সিটি এবং উত্তর ও মধ্য গাজার ১৪৭টি ধ্বংস হওয়া বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১ হাজার ৭২টি মরদেহ চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রথম ধাপে ৫৪টি ধ্বংস হওয়া বাড়ি ও ভবন থেকে প্রায় ৩৩৩টি মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছিল।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭৩ হাজার ৬৫১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭৫ জন আহত হয়েছেন।
তথ্যসূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড