EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

ব্রিটেনের খুচরা বাণিজ্যে বদলাচ্ছে চীনা রোবটের হাত ধরে, বাড়ছে স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থা

টেসকো, অ্যাসডা থেকে নেক্সট, যুক্তরাজ্যের শীর্ষ খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুদামে বদলে যাচ্ছে পণ্য ব্যবস্থাপনার চিরচেনা চিত্র

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

ব্রিটেনের খুচরা বাণিজ্যে বদলাচ্ছে চীনা রোবটের হাত ধরে, বাড়ছে স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যের একটি গুদামে পণ্য বহন করছে চীনের তৈরি স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবট। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

অনলাইনে কোনো পণ্য অর্ডার করার পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় সেটির প্রক্রিয়াকরণ। এই কাজের পেছনে এখন ক্রমেই বড় ভূমিকা রাখছে চীনের তৈরি স্বয়ংক্রিয় রোবট। যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গুদাম ব্যবস্থাপনায় এসব রোবটের ব্যবহার বাড়াচ্ছে, যা দেশটির খুচরা বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।

চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হেফেইয়ে অবস্থিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গিক প্লাসের কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব রোবট। প্রতিষ্ঠানটির ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারদের ভাষ্যমতে, সেখানে তৈরি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুদামে পাঠানো হচ্ছে এসব স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবট। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় খুচরা প্রতিষ্ঠান টেসকো, অ্যাসডা ও নেক্সটসহ একাধিক কোম্পানি তাদের গুদাম পরিচালনায় গিক প্লাসের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

গুদামের মেঝেজুড়ে চলাচলকারী ছোট আকারের রুপালি রঙের এসব রোবট স্টোরেজ র‍্যাকের নিচে গিয়ে পুরো তাকটিই তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট কর্মীর কাছে পৌঁছে দেয়। ফলে কর্মীদের দীর্ঘ পথ হেঁটে পণ্য সংগ্রহ করতে হয় না, অর্ডার প্রস্তুতের সময় কমে আসে এবং কাজের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

গিক প্লাসের দাবি, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি এমন জায়গাতেও পণ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যেখানে মানুষের পৌঁছানো কঠিন। একই সঙ্গে কমে আসছে পণ্য বাছাইয়ের ভুলও। প্রচলিত স্বয়ংক্রিয় গুদাম ব্যবস্থার মতো স্থায়ী কনভেয়র বেল্ট বা জটিল অবকাঠামোর প্রয়োজনও হয় না এতে— কেবল মেঝেতে বসানো কিউআর কোড চিহ্ন ও নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমেই এসব রোবট পরিচালনা করা যায়। ফলে তুলনামূলক কম খরচে ও দ্রুত সময়ে এই প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হচ্ছে।

গত বছর হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় গিক প্লাস, যা ২০২৫ সালের অন্যতম বড় রোবটিকস শেয়ার বিক্রির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বয়ংক্রিয় মোবাইল রোবট সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘোষিত ‘নিউ কোয়ালিটি প্রোডাকটিভ ফোর্সেস’ কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার এখন রোবটিকস শিল্প। দেশটির কর্মক্ষম জনসংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকায় উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে এবং বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে বেইজিং।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যানের মতে, চীনের রোবটিকস খাতের এই উত্থান মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি শিল্পের সাফল্যেরই ধারাবাহিকতা। ইভির জন্য তৈরি ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, ক্যামেরা, সেন্সর ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিই এখন কাজে লাগছে রোবট তৈরিতে, যার ফলে দুটি শিল্পের মধ্যে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা।

চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্সপেং গত বছর তাদের মানবসদৃশ রোবট ‘আয়রন’ উন্মোচন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা হে শিয়াওপেং জানিয়েছেন, তিনি আর এক্সপেংকে শুধু একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না। তার ভাষায়, তারা এক্সপেংকে একটি উচ্চপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে চান, আর ভবিষ্যতে প্রতিটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই গাড়ি ও রোবট— উভয় প্রযুক্তি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে বলে তার বিশ্বাস।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে যেভাবে দ্রুত বৈশ্বিক অবস্থান তৈরি করেছে চীন, রোবটিকস শিল্পেও একই পথ অনুসরণের চেষ্টা করছে দেশটি। শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা, বিস্তৃত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনার সক্ষমতা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।

তবে বৈশ্বিক রোবট শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার চীনের পরিকল্পনা সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশে তৈরি উন্নত রোবট আমদানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, বেইজিং বরাবরই বাণিজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং ভিত্তিহীন অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধিতা করে এসেছে।

গিক প্লাসের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ইয়ানইউ লিউ জানিয়েছেন, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য শুধু পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো নয়, বরং সম্পূর্ণ গুদাম ব্যবস্থাকেই মানববিহীন বা পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করে তোলা। তার ভাষায়, ভবিষ্যতে পণ্য সংগ্রহ, স্থানান্তর এবং সবশেষে প্যাকেজিং— এই সবগুলো ধাপই স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

চীনের অ্যাজিবট ও ইউনিট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানবসদৃশ বা হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গুদাম ব্যবস্থাপনায় এসব রোবটের বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। কারণ চাকার ওপর চলা রোবট যদি কম খরচে দক্ষতার সঙ্গে পণ্য পরিবহন করতে পারে এবং রোবটিক বাহু দিয়ে অন্যান্য কাজও সম্পন্ন করা যায়, তাহলে মানবসদৃশ রোবটের অতিরিক্ত সুবিধা কী হবে— সেই প্রশ্ন এখনো থেকে যাচ্ছে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে কারখানা, হাসপাতাল কিংবা অফিসের মতো মানুষের জন্য নির্মিত পরিবেশেও কোনো পরিবর্তন ছাড়াই কাজ করতে পারবে মানবসদৃশ রোবট। যদিও বর্তমান প্রযুক্তি এখনো এমন অনেক সূক্ষ্ম ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলেই মনে করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চাপ এবং শ্রমিক সংকটের কারণে যুক্তরাজ্যে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আর এই সুযোগেই দেশটির গুদামগুলো পরিণত হচ্ছে চীনের পরবর্তী প্রজন্মের রোবট প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক রোবটিকস শিল্পে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি রপ্তানির বাজারও সম্প্রসারণ করতে চাইছে চীন।

আরও পড়ুন