EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল, সরানো হলো ২০ হাজার মানুষ

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল, সরানো হলো ২০ হাজার মানুষ
অ অ

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানলের কারণে ২০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশটির গিরন্দ অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৭০০ দমকলকর্মী কাজ করছেন।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আর্কাশোঁ উপসাগরের আশপাশে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। আগুনের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় আরও ৮ হাজার ৮০০ মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাতে যাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের বড় অংশই ছিলেন লেজ-ক্যাপ-ফেরে উপদ্বীপের বিভিন্ন ক্যাম্পসাইটে থাকা পর্যটক। গিরন্দ অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান সোফি ব্রোকা জানান, সরিয়ে নেওয়া মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার ছিলেন পর্যটক।

তিনি বলেন, আর্কাশোঁ উপসাগরের তীরবর্তী ক্লাউয়ে গ্রামের সর্বশেষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। এখন পর্যন্ত কেউ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বনাঞ্চল ও কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গিরন্দ দমকল বিভাগের প্রধান মার্ক ভেরমেউলেন বলেন, 'সারা রাত একটানা কাজ করতে হয়েছে।

তিনি সতর্ক করে জানান, তাপমাত্রা বাড়ছে এবং বাতাসের গতি আরো শক্তিশালী হচ্ছে, ফলে আগুনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। 

তিনি বলেন, 'রাত ৮টার দিকে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে পারে। এরপর আমাদের পরিবর্তনশীল বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তাই আমরা এমন একটি আগুনের মুখোমুখি হয়েছি, যার গতিপথ অনুমান করা খুব কঠিন। এ কারণে সতর্কতা কমানোর কোনো সুযোগ নেই।

এর আগে সপ্তাহের শুরুতে বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে আরেকটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় দুই স্থানীয় দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়। উপকূলীয় শহর ল্য পোর্জের ১৯ বছর বয়সী বাসিন্দা ইয়াসমিনা দে ফ্রেইতাস জানান, বুধবার দুপুরে তিনি প্রথম ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধ অনুভব করেন। 

তিনি বলেন, বিকেলের দিকে আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঘন ধোঁয়া। পরে ছাই এবং আধাপোড়া গাছের বাকলও পড়তে শুরু করে। রাত প্রায় আটটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিবারকে সরিয়ে পাশের একটি শহরের জিমনেশিয়ামে নিয়ে যায়। তাড়াহুড়োর কারণে তারা তাদের দুটি বিড়াল ও চারটি মুরগি রেখে যেতে বাধ্য হন। ইয়াসমিনা বলেন, তিনি পুরো রাত ঘুমাতে পারেননি। আগুন কতটা ছড়াচ্ছে তা দেখতে প্রতি ঘণ্টায় জেগে উঠছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি দেখছিলাম, পুড়ে যাওয়া এলাকার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।'

বিবিসির দক্ষিণাঞ্চলের উপস্থাপক জো কেন্টও ওই এলাকার একটি ক্যাম্পসাইটে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেক পর্যটক ইতোমধ্যে ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি বলেন, উপদ্বীপের দক্ষিণে যাওয়ার প্রধান সড়ক, যেখানে সাধারণত প্রচুর গাড়ি থাকে, এখন প্রায় ফাঁকা। এমনকি সুপারমার্কেটগুলোতেও অস্বাভাবিক নীরবতা দেখা যাচ্ছে।

ফ্রান্স ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেন ও ইতালিতেও আগুন নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভার অঞ্চলে আগুনের কারণে যেসব বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদের বৃহস্পতিবার সকালে বাড়িতে ফিরে ক্ষয়ক্ষতি দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন সতর্ক করেছে, বিকেলে বাতাসের গতি বাড়লে আগুন আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে নিহত দুই দমকলকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি তাদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমর্থন জানান।

ইতালির সিসিলি দ্বীপে দাবানল নেভানোর সময় এক দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সান কাতালদো এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার সময় তিনি মারা যান। সিসিলির আঞ্চলিক নেতা রেনাতো শিফানি আহত আরেক দমকলকর্মীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি নিহত দমকলকর্মী আলেসান্দ্রো মার্কির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, মানুষের সেবা করতে গিয়েই তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। সিসিলির সিভিল প্রোটেকশন বিভাগের প্রধান সালভো কুচিনা জানান, দ্বীপটিতে ৩৫০টির বেশি দাবানল ছড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ছিল বড় ধরনের। এসব আগুনের কারণে অনেক মানুষকে সতর্কতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এসব আগুনের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ড দায়ী। দাবানল মোকাবিলা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলার সমস্যাও হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পেনে মাদ্রিদের পশ্চিমে আলদেয়া দেল ফ্রেসনো এলাকার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বাসিন্দাকে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাছাকাছি এলাকায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া দাবানলের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে মাদ্রিদের দক্ষিণে আলমোরক্স গ্রামের বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ এখন ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরছেন।

তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রায় ৮৯০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। দেশটির গুয়াদালাহারা অঞ্চলে এ বছরের সবচেয়ে বড় দাবানল দেখা গেছে। সেখানে ৩৫ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ইউরোপীয় বন আগুন তথ্য ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত স্পেনে যত দাবানল হয়েছে, তা ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায়ও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে। কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকায় গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপে দাবানলে পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ এবং আগুন থেকে নির্গত দূষণের মাত্রা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

আরও পড়ুন