EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

তেহরান থেকে খামেনির শেষ গন্তব্য মাশহাদে, এ শহর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালে এই মাশহাদ শহরেই। তার শৈশব, প্রাথমিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ এখানেই কেটেছে।

সায়মা ইসলাম

সায়মা ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম

তেহরান থেকে খামেনির শেষ গন্তব্য মাশহাদে, এ শহর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা তেহরানে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তার জন্মভূমি মাশহাদে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কয়েক দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠানের শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে এই পবিত্র শহরেই, যেখানে তাকে সমাহিত করা হবে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। 

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের স্থান হিসেবে মাশহাদকে বেছে নেওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরানের এই ঐতিহাসিক শহর। এ শহর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোরাসান-এ-রাযাভি প্রদেশের রাজধানী মাশহাদ দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শুধু জনসংখ্যার দিক থেকেই নয়, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণেও এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে কয়েক কোটির বেশি মানুষ এই শহরে আসেন, যার প্রধান কারণ শিয়া মুসলমানদের অষ্টম ইমাম হযরত ইমাম আলী আল-রেজা (আ.)-এর পবিত্র রওজা মোবারক।

শিয়া মুসলমানদের কাছে মাশহাদ শুধু একটি শহর নয়, এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান। অনেকেই শহরটিকে ‘মাশহাদে মোকাদ্দাস’ বা ‘পবিত্র মাশহাদ’ নামে অভিহিত করেন।

শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের আমলে ইমাম রেজা (আ.)-কে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয় এবং তিনি বর্তমান মাশহাদেই শাহাদাতবরণ করেন। এ কারণেই শহরটির নাম হয় ‘মাশহাদ’। আরবি শব্দ ‘মাশহাদ’ অর্থ ‘শহীদ হওয়ার স্থান’ বা ‘শহীদের স্থান’। একজন শহীদ ইমামের সমাধি এখানে অবস্থিত হওয়ায় শহরটি শিয়া মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র নগরীতে পরিণত হয়েছে।

ইমাম রেজা (আ.)-এর রওজাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্সে প্রতিদিন হাজার হাজার এবং বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষে লাখো মানুষ ইবাদত ও জিয়ারতের জন্য সমবেত হন। ইরানের ধর্মীয় পর্যটনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রও এই শহর।

ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি মাশহাদের রাজনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। ইরানের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘আস্তান কুদস রাযাভি’ ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার পরিচালনা করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট ও সামাজিক কল্যাণমূলক নানা খাতে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। বিশাল অর্থনৈতিক সামর্থ্যের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ইরানের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালে এই মাশহাদ শহরেই। তার শৈশব, প্রাথমিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ এখানেই কেটেছে। জন্মভূমির সঙ্গে এই দীর্ঘ সম্পর্কের কারণেই মৃত্যুর পর তাকে মাশহাদে দাফনের সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সরকারি ঘোষণার তথ্য অনুযায়ী, তেহরানসহ একাধিক স্থানে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শেষে মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার-সংলগ্ন এলাকায় তাকে সমাহিত করা হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও মাশহাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এটি ইরানের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় শহরটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগের মাধ্যমে এটি দেশের অন্যতম বড় পরিবহন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

মাশহাদ ইরানের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র। প্রতিবছর কোটি কোটি তীর্থযাত্রীর আগমনে হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়। ফলে শহরটি ইরানের ধর্মীয় পর্যটননির্ভর অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মাশহাদের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। এখানে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বহু খ্যাতিমান আলেম, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদের সঙ্গে এই শহরের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক উচ্চশিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে মাশহাদের পরিচিতি রয়েছে।

নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী অবস্থান এবং প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রীর সমাগমের কারণে এখানে সর্বদা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। ইরানের পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও মাশহাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

সব মিলিয়ে মাশহাদ কেবল ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নয়; এটি দেশটির ধর্মীয় ঐতিহ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক শক্তি এবং কৌশলগত অবস্থানের এক অনন্য প্রতীক। আর সেই কারণেই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ ঠিকানা হিসেবে মাশহাদকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তও শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, বরং ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

আরও পড়ুন