EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

আলী খামেনির জানাজায় কেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ছিলেন না

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ এএম

আলী খামেনির জানাজায় কেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ছিলেন না
অ অ

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। রবিবার রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত জানাজায় দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতারা উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন তার উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত ছেলে মোজতবা খামেনি। তার এই অনুপস্থিতিকে ঘিরে দেশ-বিদেশে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।

রবিবারের জানাজায় আলী খামেনির অন্য তিন ছেলে—মাসউদ, মোস্তফা ও মেইসাম—উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

তবে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার সময় মোজতবাও আহত হয়েছিলেন। যদিও এ বিষয়ে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

কোটি মানুষের অংশগ্রহণের দাবি

ইরানের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবেন। দেশটির কর্তৃপক্ষ এই কর্মসূচিকে 'শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া' হিসেবে বর্ণনা করছে।

রবিবার ইরানজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে ইমামতি করেন ৯৭ বছর বয়সী বিশিষ্ট শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তাবরিজি। পরে খামেনির মরদেহ রাজধানীতে শোকযাত্রার প্রস্তুতির জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়।

সরকারি কর্মসূচি অনুযায়ী, সোমবার তেহরানে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে পবিত্র নগরী কোমে, বুধবার ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় স্থানে এবং বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

মোজতবার অনুপস্থিতি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

পুরো অনুষ্ঠান অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হলেও মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই তাকে জনসমক্ষে আনা হয়নি। বিশেষ করে আশঙ্কা রয়েছে, ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যদিও উভয় পক্ষই প্রয়োজনে আবার সামরিক অভিযান চালানোর সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছে।

ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক

সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ট্রাম্পের বরাত দিয়ে বলা হয়, জানাজায় ইরানের বহু শীর্ষ কর্মকর্তা একত্রিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে একটি হামলায় তাদের সবাইকে হত্যা করতে পারত। তবে তিনি বলেন, "আমরা তা করব না, কারণ তাহলে আলোচনার জন্য আর কাউকে পাওয়া যাবে না।"

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি ভেবেছিলেন ইরানের মানুষ আলী খামেনিকে ঘৃণা করত। তাই লাখো মানুষের শোক প্রকাশ দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন এবং মন্তব্য করেন, "হয়তো ওগুলো ভুয়া কান্না।"

তার এ মন্তব্যের জবাবে ৫০ বছর বয়সী শোকাহত জাহরা সাফায়ি রয়টার্সকে বলেন, "আমরা ৪৭ বছর আগে ভুয়া কান্নার জন্য বিপ্লব করিনি। এত শহীদের আত্মত্যাগও ভুয়া কান্নার জন্য নয়।"

জানাজায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

কবি মোহাম্মদ রাসুলি প্রার্থনার আগে কবিতা আবৃত্তির সময় ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাকে "আমেরিকার মৃত্যু হোক" এবং "ইসরায়েলের মৃত্যু হোক" স্লোগান দিতেও শোনা যায়।

রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন স্থানে শোকযাত্রীদের হাতে "ট্রাম্পকে হত্যা করো", "বিবিকে (বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু) হত্যা করো" এবং "আমরা প্রতিশোধ নেব" লেখা ব্যানারও দেখা গেছে।

কঠোর নিরাপত্তা, চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজারের বেশি মানুষ

অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে পদদলিত হওয়ার আশঙ্কায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চার হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে শোকাহতদের স্বস্তি দিতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছে এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের স্ট্রেচারে করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে খামেনির কফিনের পাশে তেহরানে হামলায় নিহত তার পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তার এক বছর বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও রয়েছেন।

১৯৮৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। দীর্ঘ শাসনামলে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ নীতি অনুসরণ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী—যেমন হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসেন। তার মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন