মমতা ব্যানার্জীর হাতছাড়া হতে পারে কি তৃণমূলের প্রতীক ও সম্পত্তি?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১০:২৮ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট। দলটির ভেতরে ব্যাপক ভাঙন ও বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর হাত থেকে কি শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই নয়, দলীয় প্রতীক ও বিপুল সম্পদের মালিকানাও সরে যেতে পারে?
সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
দলীয় সূত্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, বিধানসভার ৮০ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়ক বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে, লোকসভা ও রাজ্যসভার মিলিয়ে তৃণমূলের ৪১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন।
বিদ্রোহী বিধায়কদের পক্ষ থেকে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে স্বাক্ষর জমা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তৃণমূলের একদল বিদ্রোহী সংসদ সদস্য। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিদ্রোহী সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে একটি অংশ ইতোমধ্যে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।
প্রতীক ও সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ কীভাবে হয়?
ভারতের নির্বাচনী আইনে কোনো রাজনৈতিক দল ভেঙে গেলে তার প্রতীক ও সাংগঠনিক মালিকানা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
‘ইলেকশন সিম্বলস (রিজারভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার, ১৯৬৮’-এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দলীয় বিরোধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে প্রতীকের বৈধ দাবিদার নির্ধারণ করতে পারে।
১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ‘সাদিক আলি বনাম নির্বাচন কমিশন’ মামলার রায়ের ভিত্তিতে কমিশন সাধারণত বিবেচনা করে—দলের কতজন এমপি, এমএলএ ও সাংগঠনিক নেতা কোন পক্ষের সঙ্গে রয়েছেন।
ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা জানিয়েছেন, কোনো পক্ষ নিজেদের ‘প্রকৃত দল’ দাবি করে কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না দিলে নির্বাচন কমিশন সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না।
তবে এখন পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়নি।
তৃণমূলের ভাঙন কেন ব্যতিক্রম?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের সাম্প্রতিক দলভাঙার ঘটনাগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন।
রাজ্যে ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে যে বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, তারা এখনো বিজেপিবিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে দিল্লিতে সক্রিয় বিদ্রোহী সাংসদদের একটি অংশ প্রকাশ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে।
ফলে তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত তিনটি পৃথক রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ভারতীয় রাজনীতিতে এ ধরনের ত্রিমুখী বিভাজনের নজির খুব কম।
ঝুঁকিতে হাজার কোটি টাকার সম্পদ?
দলের প্রতীক নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে প্রশ্ন উঠতে পারে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল সম্পদের মালিকানা নিয়েও।
সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে স্থাবর সম্পত্তি, বিনিয়োগ এবং শত শত কোটি টাকার ব্যাংক আমানত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নির্বাচন কমিশন কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দলটির বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে শুধু প্রতীক নয়, দলীয় সম্পদের ওপরও সেই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
অতীতে কী ঘটেছে?
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলভাঙার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও এনসিপি।
শিবসেনার ভাঙনের পর একনাথ শিন্ডে গোষ্ঠী দলীয় প্রতীক ও সাংগঠনিক স্বীকৃতি পায়। একইভাবে শরদ পাওয়ারের প্রতিষ্ঠিত এনসিপির প্রতীক ও নিয়ন্ত্রণও পরে অজিত পাওয়ারের হাতে চলে যায়।
এর আগে কংগ্রেস, জনতা দল, এআইএডিএমকে এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও বিভাজনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও আদালতের সিদ্ধান্তে প্রতীক ও সাংগঠনিক উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়েছে।
এখন কী হতে পারে?
তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট কোন দিকে গড়ায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি উত্থাপন করে কি না তার ওপর।
যদি কোনো পক্ষ নিজেদের ‘প্রকৃত তৃণমূল’ দাবি করে কমিশনের দ্বারস্থ হয়, তাহলে দলের সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন এবং দলীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে নির্বাচন কমিশন।
সেক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের সূচনা হতে পারে। সূত্র: বিবিসি